সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      ১৫ জুলাই সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ      সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী      দীর্ঘ হচ্ছে হামে মৃত্যুর মিছিল      ডুবল ঢাকা ভুগল মানুষ      
খোলাকাগজ স্পেশাল
চুক্তি যখন গলার কাঁটা
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:১৯ এএম আপডেট: ২২.০৪.২০২৬ ৯:৩৫ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি এখন অস্বস্তির কারণ ও তীব্র বিতর্কের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। শুরুতে যেটিকে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেটিই এখন নানা শর্ত ও বাধ্যবাধকতার কারণে শুধু বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়, বরং ‘গলার কাঁটা’ হিসেবে সামনে দৃশ্যমান হচ্ছে।

বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বাণিজ্য কাঠামো, কৃষি খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামরিক ভারসাম্য ও কৌশলগত স্বাধীনতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে দ্রুত সম্পন্ন হওয়া এই চুক্তিকে ঘিরে অসমতা, বাধ্যতামূলক আমদানি এবং সার্বভৌমত্বের ইস্যু সামনে এনে ইতোমধ্যে নানা মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে তড়িঘড়ি করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করে।

এ চুক্তিই এখন তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। চুক্তির অন্যতম বড় বিতর্কের জায়গা হলো এর অসম কাঠামো। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর তুলনামূলক উচ্চ শুল্কহার বহাল রেখেছে, যেখানে বাংলাদেশকে নিজের বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে উন্মুক্ত করতে হচ্ছে। ফলে ‘পারস্পরিকতা’ শব্দটি কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর—সে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে শর্তসাপেক্ষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি অনেকেই সীমাবদ্ধ সুযোগ হিসেবেই দেখছেন।

উদ্বেগের বিষয় হলো, চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে বড় অঙ্কের মার্কিন পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বিমান, জ্বালানি, কৃষিপণ্য এবং সম্ভাব্য সামরিক সরঞ্জাম। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। এমনকি, এটি এক ধরনের ‘বাধ্যতামূলক আমদানিনির্ভরতা’ তৈরি করবে, যা দেশের নিজস্ব উৎপাদন ও শিল্প বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশকে আমেরিকা থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে হবে এবং আগামী ১৫ বছরে ১৫০০ কোটি ডলারের তেল ক্রয় করতে হবে। এ ছাড়া প্রতিবছর ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশকে প্রতিবছর কমপক্ষে ৭ লাখ টন গম যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হবে।

একইসঙ্গে সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে বছরে ১.২৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের, অথবা সর্বোচ্চ ২৬ লাখ টন—যেটি কম হয়—পরিমাণ পণ্য ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া তুলা আমদানির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এ খাতে মোট আমদানির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার (৩৫০ কোটি ডলার)।

চুক্তি অনুযায়ী, ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে তথ্য প্রবাহ অবাধ রাখবে এবং ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর কোনো কাস্টমস শুল্ক আরোপ করবে না। একইসঙ্গে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর বৈষম্যমূলক ডিজিটাল কর আরোপ করা যাবে না এবং সাইবার নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশ পারস্পরিক সহযোগিতা করবে।

মেধাস্বত্ব সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে আরও কঠোর হতে হবে। অনলাইন পাইরেসি দমন, কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং সীমান্তে জাল পণ্য প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রম অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যেমন শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধ করা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ সহজ করা, ইপিজেড এলাকায় শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখা।

পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বন উজাড় ও বন্যপ্রাণী পাচার রোধ এবং টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

সেবা ও বিনিয়োগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তেল-গ্যাস, বিমা ও টেলিযোগাযোগ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছ করার কথা বলা হয়েছে।

সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে আমেরিকার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে এবং চীন থেকে সরঞ্জাম কেনার ওপর বিধিনিষেধ থাকবে। বাংলাদেশি পণ্যে কোনো ভর্তুকি দেওয়া যাবে না এবং আমেরিকান পণ্যের ওপর কোনো কোটা বা অশুল্ক বাধা আরোপ করা চলবে না। আমেরিকান পণ্যের গুণগত মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না এবং আমেরিকার আন্তর্জাতিক রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশকে মেনে চলতে হবে।

কৃষি ও পোল্ট্রি খাতে সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য আমদানির ফলে বাংলাদেশের ডেইরি ও পোল্ট্রি শিল্প ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কম দামের আমেরিকান দুধ ও পোল্ট্রি পণ্যের সঙ্গে স্থানীয় খামারিরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। এ ছাড়া আমেরিকা থেকে জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফুড আমদানির ফলে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

জ্বালানি খাতেও সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বলা হচ্ছে। তাদের মতে, রাশিয়ার ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থাকায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়াম কেনা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। অন্তর্বর্তী সরকার অনেক সর্বনাশা কাজ করেছে। তাদের অনেকে হয়তো এখন বিদেশে থাকেন। যেখানেই থাকুক, তাদের বিচার করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, একটা দেশকে দাসে পরিণত করার জন্য চুক্তি করল অন্তর্বর্তী সরকার। এখতিয়ারের মধ্যে না থাকলেও তারা এই চুক্তি ছাড়াও স্টারলিংকের সঙ্গে চুক্তি করেছে, এলএনজি আমদানির চুক্তি করেছে, চট্টগ্রাম বন্দর নিয়েও চুক্তি করেছে। সে সময় কেউ অন্তর্বর্তী সরকারকে বলেনি যে, এসব চুক্তি আপনারা করবেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবি করে সমাবেশে আনু মুহাম্মদ বলেন, এ চুক্তি বহাল থাকলে দেশের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লাখ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা চোখ, কান ও মাথা বন্ধ করা একটি জাতিতে পরিণত হব, যারা নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মাহা মির্জা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিতে এমন সব ধারা রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ও স্থানীয় শিল্পসহ সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। দেশের স্বার্থের সঙ্গে এত বড় গাদ্দারি কী করে হতে পারে—সেই প্রশ্ন করে মাহা মির্জা বলেন, এই চুক্তি পড়ে কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি। অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশকে এ দাসখতে ঢুকিয়ে গেছে।

সিনিয়র সাংবাদিক মাহবুব কামালের মতে, এ চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য একটি ‘বাণিজ্যিক অস্ত্র’ এবং এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। তবে চুক্তিতে একটি বিধান আছে, যার মাধ্যমে ৬০ দিনের নোটিসে এই চুক্তি বাতিল করা সম্ভব। তিনি বর্তমান সরকারকে এটি পুনর্মূল্যায়ন করে বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রীর পলিসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিটি আপাতত বাতিল করার কোনো সিদ্ধান্ত নেই। অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটেই এ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি বহাল থাকবে। তবে চুক্তি বাতিলের দাবিতে যারা মত দিচ্ছেন, তাদের সঙ্গে সরকার আলোচনা করবে এবং তাদের মতামত গুরুত্বসহকারে শোনা হবে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  চুক্তি   গলার কাঁটা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close