মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
বন বিভাগে দুর্নীতি-লুটপাট
মো. নেজাম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:৪১ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

চট্টগ্রামের বন বিভাগের কোনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ-দুনীতি, সরকারের অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ পর্যন্ত দুর্নীতিবাজ কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা। ফলে দিনদিন বেপরোয় হয়ে উঠেছে কর্মকর্তাদের সংঘবদ্ধ চক্রটি। দুর্নীতিবাজ এসব কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা মেরে রাতারাতি বনে গেছেন বনের রাজা। হয়েছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ, অঢেল সম্পদের মালিক।

চট্টগ্রামের বনবিভাগের এক সময়ের কনজারভেটর অব ফরেস্ট (সিএফ) বিপুল কুমার দাশের বিরুদ্ধে বেপরোয়া কর্মকাণ্ড ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তা ছাড়া সদ্য কোস্টালে বদলি হওয়া সিএফ মোল্ল্যা রেজাউল করিমের আস্থাভাজন সাদেকুর রহমান এখনো বনবিভাগে বেপরোয়া দিন কাটাচ্ছেন। কাউকে পরোয়া না করে নিজের মতো করে রেঞ্জ পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে। বনবিভাগের দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন ফরেস্ট স্টেশনে অনিয়ম এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।

জানা যায়, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কার্যালয়ের মাত্র ২০০ মিটার দূরে সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে গত দুই দিনে গড়ে তোলা হয়েছে ১৪টি ঘর। বন অফিসের এত কাছাকাছি গর্জন গাছ কেটে ঘর নির্মাণ করা হলেও এখন পর্যন্ত দখল উচ্ছেদে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বন বিভাগ। এমনকি ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা বা বিট কর্মকর্তাদের এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত দুদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র সংরক্ষিত বনের জায়গা দখল করে দ্রুতগতিতে ঘরগুলো নির্মাণ করে। দিনদুপুরে বনের জমি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের খবর এলাকার সবাই জানলেও রহস্যজনক কারণে নীরব ছিল স্থানীয় বন প্রশাসন। অনেক চেষ্টা করেও বিট ও রেঞ্জ কর্মকর্তার দেখা পাওয়া যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাহাড়ের ঢাল ও সংরক্ষিত বনের গাছপালা কেটে উজাড় করে ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। রেঞ্জ অফিসের একদম কাছে হওয়ায় এ জবরদখল নিয়ে জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের অভিযোগ, বন কর্মকর্তাদের পরোক্ষ মদদ ও সহযোগিতা ছাড়া এত কাছে বনভূমি দখল হওয়া সম্ভব নয়। বন সংরক্ষক, চট্টগ্রাম অঞ্চল ও কক্সবাজার উত্তর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও তারা নিশ্চুপ। নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ। 

দখলদাররা এখনো সক্রিয় রয়েছে। উচ্ছেদ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় সংরক্ষিত বনটি স্থায়ীভাবে হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় পরিবেশবাদীরা।

জানা যায়, সুফল (টেকসই বন ও জীবিকা) প্রকল্পে সরকারি নির্দেশনা মতে বাগান তৈরি না করে বরাদ্দের দেড় কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বন অধিদপ্তরের একটি চক্রের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের এ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা গত এক বছর ধরে বন বিভাগে ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও তদন্ত করেনি বন বিভাগ। এ চক্রের মূলহোতা সাদেকুর রহমানকে বন বিভাগ শাস্তির বদলে সম্প্রতি ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দিয়েছে।

শুধু পদোন্নতি নয়, তাকে বন বিভাগের লোভনীয় পেস্টিং খ্যাত কক্সবাজার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বন অধিদপ্তরের এসব দুর্নীতি চিহ্নিত করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে নিউজ প্রকাশিত হওয়ার পর বনায়নের নামে দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ধামাচাপা দিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বনের পাশাপাশি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটের বিরুদ্ধে।

তথ্যসূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ নভেম্বর উপবন সংরক্ষক উম্মে হাবিবা চিঠি দেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সফিকুল ইসলামের কাছে। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের কুমিরা রেঞ্জে ৭০ ও ১০ হেক্টরের দুটি বাগান সৃজনে ব্যর্থতায় জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণপূর্বক দায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামের তালিকা সংশ্লিষ্ট বন সংরক্ষকের মাধ্যমে পত্রপ্রাপ্তির ৭ দিনের মধ্য তার দপ্তরে প্রেরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করেন।

অথচ পত্রপ্রাপ্তির পরও চট্টগ্রাম বন সংরক্ষকের দপ্তর থেকে উম্মে হাবিবার দপ্তরে চিঠি প্রেরণ করা হয়নি। এর আগে গত ২২ এপ্রিল উম্মে হাবিবা চিঠি দেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, সুফল প্রকল্পে ২০২৩-২০২৪ আর্থিক সনে কুমিরা রেঞ্জের কুমিরা বিটে ১৭০ হেক্টর দ্রুত বর্ধনশীল বাগান প্রথম জরিপ হয় গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর। জরিপে ১৭০ হেক্টর বাগানে জীবিত চারাগাছের হার ৬০.২০ শতাংশ।

যেখানে চারা থাকার কথা কমপক্ষে ৮০ শতাংশ। একই রেঞ্জের ১০ হেক্টরের অন্য একটি দ্রুত বর্ধনশীল বাগানে জীবিত চারার হার ৫০.৪০ শতাংশ। বাগানে জীবিত চারাগাছের হার সন্তোষজনক না বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া বাগানে চারাগাছের সংখ্যা শতভাগ নিশ্চিত করে পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটকে জানানোর জন্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে জানানো হয়।

সূত্র জানায়, বনের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিমের আস্থাভাজন হিসেবে খ্যাত ডেপুটি রেঞ্জার সাদেকুর রহমানসহ বাগানের অর্থ আত্মসাৎকারী তিন কর্মকর্তা। সরকারের দেড় কোটি টাকা লুট করে পেয়েছেন পদোন্নতি। এ বিষয়ে বন দপ্তরে চলছে অস্থিরতা।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কুমিরা রেঞ্জে বাগান তৈরির নামে টাকা আত্মসাতের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সাদেকুর রহমান। উম্মে হাবিবা কৌশল করে নামের তালিকা বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিমের মাধ্যমে চেয়েছেন, যাতে অভিযুক্ত সাদেকুর রহমানসহ বাগান তৈরিতে ব্যর্থতায় দায়ী অন্য কর্মকর্তাদের নামের তালিকা চট্টগ্রাম বন সংরক্ষকের কার্যালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে। এ চক্রটি পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটকে ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করেছে এমন প্রচারণা চালানোর খবর পাওয়া গেছে।

কুমিরা রেঞ্জে বনায়নের নামে প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্তরা হলেন, কক্সবাজার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান, উপবন সংরক্ষক (ডিসিএফ) এস.এম. কায়চার (বর্তমানে পরিচালক) বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং ইকো-পার্ক, চট্টগ্রাম। এবং সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) জয়নাল আবেদীন, যিনি বর্তমানে সিলেট বন বিভাগের হবিগঞ্জে কর্মরত আছেন।

এ বিষয়ে কক্সবাজার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান বলেন, ‘আমি এক বছর দুই মাস হয়েছে এখানে আসছি, আপনি আমার ডিএফওর (বিভাগীয় বন কর্মকর্তা) সঙ্গে একটু কথা বলুন।’

এদিকে ডিসিএফ এস.এম. কায়চারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি। তবে সিলেট হবিগঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘আমি তো অভিযুক্ত, আমি কিছু বলতে পারব না।’

সূত্র জানায় বনায়নের এ হরিলুটের ঘটনা ধামাচাপা দিতে বরাদ্দের সব অর্থ উত্তোলনের পর এই তিন কর্মকর্তাকে বদলি করে প্রাইজ পোস্টিং পদোন্নতি দিয়ে এস.এম. কায়চারকে চট্টগ্রাম, সাদেকুরকে কক্সবাজার এবং জয়নাল আবেদীনকে সিলেটে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানার জন্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. ম্যোল্লা রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেনি।

এদিকে দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটের উপবন সংরক্ষক উম্মে হাবিবা তিন কর্মকর্তা থেকে ঘুষবাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ আছে, তবে তিনি গণমাধ্যমকে তা অস্বীকার করেছেন।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  বন বিভাগ   দুর্নীতি   লুটপাট  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close