মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      ভূমিকম্পে কাঁপলো রাজধানী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
উন্নয়নশীল দেশ : কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনে বাধা কোথায়?
অলোক আচার্য
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ২:২৪ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

একটি রাষ্ট্র বা একটি সমগ্র পৃথিবীকে সবার জন্য উপভোগ্য, বাসযোগ্য অথবা ব্যবহারযোগ্য করে গড়ে তোলা সুদূরপরাহত বিষয়। স্পষ্টতই এ পৃথিবী বিভক্ত হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিভক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাষ্ট্রের শাসকরা চাইলেও একটি রাষ্ট্রকে সব নাগরিকের জন্য সমান উপভোগ্য করে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কারণ একপাশে রয়েছে সমাজের ক্ষমতাবান বা আর্থিক মাপকাঠিতে অতি উচ্চ শ্রেণির মানুষ, যারা আদৌ চান না সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠিত হোক। ফলে কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে একটি দেশকে গড়ে তোলা সত্যিই কঠিন বিষয়। আধুনিক সমস্যাবহুল বিশ্ব বা নিজ দেশে দাঁড়িয়ে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রত্যাশা নেহাতই স্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়। কারণ দেশগুলো একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত, এবং চাইলেও এ নিবিড় যোগাযোগ অস্বীকার করা যায় না। সেক্ষেত্রে কল্যাণ রাষ্ট্র আসলে কী, সেই ধারণা থাকা আবশ্যক। কল্যাণ রাষ্ট্র থাকা কতটা আবশ্যক, সেই প্রশ্নও উঠতে পারে। অথবা একটি রাষ্ট্র নিজে নিজেই কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।

কল্যাণ রাষ্ট্র বলতে এমন এক রাষ্ট্রকে বোঝায়, যা নাগরিকদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কল্যাণে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত রাখে। এ রাষ্ট্র জনগণের মৌলিক চাহিদা—যেমন খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান—নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করে। অর্থাৎ, কল্যাণ রাষ্ট্রে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলো পর্যায়ক্রমে কম-বেশি ভোগ করার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল রাষ্ট্রকে জনগণের মঙ্গলসাধনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেছিলেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের কল্যাণ কেন্দ্রীভূত হবে কেবল জনগণকে কেন্দ্র করেই। পরে অর্থনীতিবিদ এডাম স্মিথ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভূমিকার কথা বলেন। তবে আধুনিক অর্থে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের সূচনা ঘটে ১৯ শতকের শেষ দিকে জার্মান চ্যান্সেলর বিসমার্কের সময়ে। তিনি কর্মীদের জন্য সামাজিক বিমা, পেনশন এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করেন, যা আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং ১৯৩০-এর দশকের সামাজিক বিপর্যয় রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে।

এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ‘নিউ ডিল’ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের কল্যাণে ব্যাপক উদ্যোগ নেন। একইভাবে ১৯৪২ সালে ইংল্যান্ডের বেভারিজ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, যা আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের নীতিগত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগণের ভোগান্তির কারণ হয় এবং রাষ্ট্রের সুবিধা থেকে জনগণকে বঞ্চিত করে। সেই বঞ্চিত শ্রেণির বড় অংশই হয় অর্থহীন দরিদ্র মানুষ। এরই ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন উঠেছে, কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন করা কি সত্যিই অসম্ভব?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের দেশগুলোতে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। সেই ধারাবাহিকতা এখনো খানিকটা সেসব দেশে অব্যাহত আছে। তবে ধনতান্ত্রিকতার জোয়ারে সমাজে বৈষম্য দ্রুতগতিতে বাড়ছে। নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র নিজে উদ্যোগী হলে কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন দ্রুত হয়। আবার অল্প সময়ের জন্য কোনো রাষ্ট্রকে কল্যাণ রাষ্ট্র তৈরি করাও শুভ নয়; করতে হবে স্থায়ী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।
কল্যাণ রাষ্ট্র তখন ব্যর্থ হয়, যখন সমাজে ক্রমাগত ধনিক শ্রেণি বাড়তে থাকে; বিপরীতে শ্রেণিবৈষম্য দেখা যায় এবং সব নাগরিক মৌলিক অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হয়। এক শ্রেণির মানুষ, যারা দারিদ্র্যসীমার মার্জিন লেভেলে এবং মার্জিন লেভেল থেকেও নিচে বসবাস করছে, তারা সামাজিকভাবে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে। শুধু আর্থিক পার্থক্যই এসব ভিত্তি গড়ে দিচ্ছে। এর মানে এটা নয় যে সবারই প্রচুর পরিমাণ টাকা থাকতে হবে; বরং একটি ভারসাম্য থাকা দরকার।

কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন মূলত কয়েকটি মানদণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেগুলো হচ্ছে—আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, একটি সুসংহত শিক্ষাব্যবস্থা, জুতসই অর্থনৈতিক কাঠামো, পরিশীলিত সমাজব্যবস্থা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, দরিদ্রতা নির্মূল করা এবং মানবাধিকার রক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণ ইত্যাদি। আরও কিছু পারস্পরিকভাবে জড়িত বিষয় রয়েছে।
প্রথমেই যদি আমরা অর্থনীতিতে আসি, সেটাই হবে কল্যাণ রাষ্ট্র বিনির্মাণের মূল ভিত্তি। নড়বড়ে অর্থনীতি দিয়ে রাষ্ট্রের নাগরিকদের কল্যাণ করা প্রায় অসম্ভব। প্রবাদে আছে, ছেঁড়া কাঁথা একদিকে টানলে অন্যদিকে শরীর দেখা যাবেই।

সেভাবেই দুর্বল বা ওঠানামা করা অর্থনীতি দিয়ে বাজারব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা খুব কষ্টসাধ্য। নাগরিকদের পোড়াতে মূল্যস্ফীতিই যথেষ্ট। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশসহ আরও অনেক দেশই মূল্যস্ফীতির ধাক্কা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও যুদ্ধের কারণে বাজারে দ্রব্যমূল্যের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অর্থনীতি মজবুত হওয়া দরকার সবার আগে। মানুষের আয়-ব্যয়ে সামঞ্জস্য থাকা দরকার। যখন আয়ের তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, তখন ঋণের বোঝা চাপবে।

মানুষের খরচের প্রধান ধাক্কাটা যায় খাদ্যে। এরপরই আসে চিকিৎসার ব্যয়, তারপর পোশাক ও অন্যান্য খরচ। এমনকি বিনোদনও আজ খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সব থেকেও যদি বিনোদনের সুযোগ না থাকে, তাহলে নাগরিকের কর্মক্ষমতা কমতে থাকবে। অথচ সংসার চালাতে যদি ঋণের দারস্থ হতে হয়, তাহলে তা আরও খারাপ। ঋণের বোঝা মাথায় থাকলে রাষ্ট্র বা ব্যক্তি—উন্নয়ন অসম্ভব।

কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রথমেই রয়েছে রাষ্ট্রপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলো সবার জন্য আবশ্যিকভাবে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। এ সবকটির পেছনেই রয়েছে আর্থিক সক্ষমতা। টাকা থাকলে এসব পাবেন, আর না থাকলে পাবেন না—এটা না হয়ে কিছু বিষয় আরও সহজ করা যায়। সেই কাজটি করতে পারে রাষ্ট্র নিজে। বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষকে বিলাসদ্রব্য নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে তার সঞ্চয়ে হাত দিতে না হয় বা ধার নিতে না হয়। নাগরিক ভোগান্তি লাঘব করাই কল্যাণ রাষ্ট্রের সরকারের মূল চেতনা।

মৌলিক অধিকারের অন্যতম হলো চিকিৎসাসেবা। গ্রাম ও শহরের চিকিৎসার মধ্যে এ ব্যবধান দূর করা জরুরি। একজন মানুষ গ্রামে থেকেও কীভাবে উন্নত চিকিৎসাসেবা পেতে পারে, সেই নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে। এখানে দুটি প্রধান লাভ রয়েছে। চিকিৎসার জন্য প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ শহরমুখী হচ্ছে, ছুটছেন নামিদামি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। এটি যদি উপজেলা পর্যায়ে, এমনকি জেলাতেই দেওয়া সম্ভব হয়, তখন শহরমুখী এই স্রোত ঠেকানো যাবে। পাশাপাশি খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষের বিপুল আর্থিক সাশ্রয়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়রানিও কমবে।

কিন্তু প্রশ্ন এখানে নিশ্চয়তা ও নির্ভরতা। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীকে অবশ্যই এ স্তরের চিকিৎসা ও চিকিৎসকের প্রতি আস্থা রাখতে হবে। এখন যেমন চিকিৎসকদের দিকে আঙুল তোলা হয়, সেই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কোম্পানির প্রতিনিধিদের নানা ধরনের উপটৌকন প্রদান, যখন-তখন ডাক্তারের চেম্বারে থাকা ও রোগী দেখার সময় বিরক্ত করা—এসব বন্ধ করতে হবে।

এখানে উল্লেখ করা যায় যে, সব ক্ষেত্রেই দরকার আইনের একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো বা চেইন অব কমান্ড। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কোনো অপরাধেরই যেন বিচারহীন অবস্থা না থাকে, তা নিশ্চিত করা দরকার। আইনের কাঠামো এমন হবে, যেখানে প্রত্যেকেই সমান সুবিধা পাবে। যখনই এর হেরফের হবে, তখনই মানুষের মনে বিরূপ ধারণার জন্ম হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি হতে পারে।

এরপর যদি আমরা শিক্ষার দিকে আসি, তাহলে দেখব—রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা যত শক্তিশালী বা টেকসই, সেই রাষ্ট্রের উন্নয়ন ততটাই টেকসই। আপনি শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে কোনো খাতেই যথেষ্ট উন্নতি করতে পারবেন না। গোঁড়ামিমুক্ত একটি সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করে এবং প্রয়োগমূলক বা কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে রাষ্ট্রকে একটি কার্যকর ও দক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। “সবার জন্য শিক্ষা”—এ বাণী শুধু পুস্তকে নয়, বাস্তবেও প্রয়োগ করতে হবে।

এখন যেভাবে শিক্ষাকে বারবার কাটাছেঁড়া করা হয়, বছর বছর কারিকুলাম ওলটপালট করা হয় বা শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা করা চলবে না। একটি স্থায়ী কারিকুলাম ও স্থায়ী শিক্ষা পদ্ধতি প্রণয়ন করতে হবে।

রাষ্ট্রকে কল্যাণের দিকে নিয়ে যেতে হলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অথচ ঘরে-বাইরে আমাদের ক্ষমতা আর দুর্নীতির আঁচড়। একটি বড় অংশ কোনো না কোনোভাবে, কেউ অনিচ্ছাতেও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। আসলে দীর্ঘদিনের চলে আসা সিস্টেমের অংশ হয়ে সব সময় এর বিরুদ্ধে থাকা যায় না। এ সিস্টেমটাকেই পাল্টাতে হবে।

নাগরিক হলো সম্পদ, আর সে সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রই কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, যদি একটি সমন্বিত পরিকল্পনার বাস্তবায়নের উদ্যোগ থেমে না যায়।


লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট


আরও সংবাদ   বিষয়:  উন্নয়নশীল   দেশ   কল্যাণ   কোথায়  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close