মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
দেশজুড়ে
হস্তান্তরের আগেই ফাটলে জর্জরিত সোয়া দুই কোটি টাকার স্কুল-আশ্রয়কেন্দ্র
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:০১ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে হস্তান্তরের আগেই প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেকরীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফ্লাড শ্লেডারের বিভিন্ন অংশে বহু ফাটল দেখা দিয়েছে। নিম্নমানের কাজ দেখে শুরুতেই অভিযোগ করেছিলেন স্থানীয়রা। কিন্তু কোনো কর্ণপাত করেননি সংশ্লিষ্টরা। চরম আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় আছেন ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।

এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের বেকরীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফ্লাড শ্লেডার নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পান রংপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাহিতি এন্ড জেডএইচডি (জেবি)। কাজটি করেন সুন্দরগঞ্জে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পলাশ এন্টারপ্রাইজ। কাজটি শুরু করার তারিখ ছিলো ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর। শেষে করার কথা ছিলো ২০২৩ সালের ১৯ জুন। সেই কাজ শেষ করা করা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। বিল্ডিং হস্তান্তর করা হয় চলতি মাসের ৮ তারিখে। কাজটির চুক্তিমূল্য ছিলো ২ কোটি ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬২ টাকা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সুদৃশ্য একটি তিন তলা ভবন। ওঠানামা করার জন্য সিঁড়ি আছে দুইটি। একটি র‍্যালিং সিঁড়ি, আরেকটি স্বাভাবিক সিঁড়ি। তবে র‍্যালিং সিঁড়িটা নীচ থেকে একবারে বিল্ডিং এর তৃতীয় তলায় সংযোগ দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তলা পড়াশোনার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর নীচ তলা ব্যবহৃত হবে বন্যায় আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে। পুরো র‍্যালিং সিঁড়িতে অসংখ্য ফাটল দেখা গেছে। বিল্ডিং এর পলেস্তার এখনে ফেটে চৌচির হয়েছে। বিশাল ফাটল দেখা গেছে পানির টাংকিতেও। বিদ্যুৎ এর লাইনগুলো বিপদজনক অবস্থায় দেখা গেছে। বোর্ডে সুইচের স্থানগুলো ফাঁকা রয়েছে। অসাবধানতা বশত যে কেউ হাত দিলে বিদ্যুৎ শক খেতে পারে। 

এদিকে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে র‍্যালিং সিঁড়িতে থাকা কেঁচি গেটটা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আর এ ফাটলগুলো বিল্ডিং হস্তান্তরের আগেই দেখা দিয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে ঠিকাদার এবং এলজিইডি অফিসের প্রধান তপন কুমার চক্রবর্তীর সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন। তারা কোনো গুরুত্ব দেননি। এমনকি ইউএনও, টিও, এটিও-কে অনেকবার বিদ্যালয়ে ডেকেছেন তারা। ২৪৯ শিক্ষার্থী নিয়ে আতঙ্কে পাঠদান কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।

স্থানীয়রা জানান, এটা কেবলমাত্র বিদ্যালয় নয়। বন্যার সময় এ অঞ্চলের মানুষজন এতে আশ্রয় নিবে। আশ্রয় নিবে গবাদিপশুও। বানভাসি মানুষের দীর্ঘদিনের দাবী ছিলো এ আশ্রয় কেন্দ্রটি। কিন্তু সেটিতে যেভাবে ফাটল দেখা দিয়েছে তাতে মনে হচ্ছে সরকারের টাকাগুলো যেনো বানের জলে ভেসে না যায়। 

তারা আরও জানান, শুরু থেকেই ঠিকাদারের লোকজন নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করছিলেন। ইঞ্জিনিয়ার অফিসের লোকজনদের এখানে আসতে তেমন একটা দেখিনি। সে কারণে অনিয়মের কথাগুলো ঠিকাদারের লোকজনকে বলেছিলাম। উল্টো তারাই আমাদের ধমক দিয়েছেন। আমরা তো অতো বুঝি না। কাজ শেষ হতে না হতেই সিঁড়িতে যে ফাটল দেখা দিয়েছে তাতে মনে হয় ভিতরে না জানি আরও কতো অনিয়ম হয়েছে। সবমিলিয়ে এ বিল্ডিং নিয়ে চরম আতঙ্ক আর উৎকন্ঠায় আছেন এলাকার সাধারণ মানুষজন।

রামডাকুয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. রমজান আলী বলেন, ‘এই স্কুলে আমার বাচ্চা ক্লাস ওয়ানে পড়ে। গতকাইল আমি আমার বাচ্চাকে স্কুলে দিতে আসি। বাচ্চা নিয়া র‍্যালিং সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার সময় দেখি সিঁড়িগুলা ফাটা। তারপরও ভয়ে ভয়ে উপরে উঠি। এরপরে উপরে উঠে দেখি তালা দেওয়া। পরে আবার নীচে নামি। পরে অন্য সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠি বাচ্চা নিয়া। পরে স্যারদের বললাম সিঁড়ির মুখ বন্ধ ক্যা। তখন তারা বলেন, সিঁড়িগুলোতে ফাটল দেখা দিয়েছে। সে কারণে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যাতে করে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। তবে ফাটলগুলো দেখার পর থেকে আমরাও আতঙ্কে আছি বাচ্চাদের নিয়ে।’

বিদ্যালয়ের পাশেই বাড়ি মো. খলিলুর রহমানের (৬৫)। এ বিষয়ে কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, ‘বিল্ডিংটা করার এখনো ৩ মাস হয়নাই। তাতে যে ফাটল ধরইছে। তাতে মনে হয় আরও দিন গেইলে কি যে হউবে আল্লায় সেটা ভালো জানে। তবে এই স্কুলে ছেলেমেয়েরা যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ জিউ হামার হাতোত থাকে। না জানি কখন কোন বিপদ হয়। আরও বন্যা আইলে কি যে হইবে সেই টেনশনও মাথায় ঘুরপাক করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওরা কাজ খারাপ করছিলো। বিধায় আমরা গ্রামের মানুষজন বলছিলাম। তা ওমরা শোনে নাই। ওমরা ওমার মতি করি কাজ করি গেইছে। হামার কথা শোনে নাই।’

মো. খলিলুর রহমান জানান, ‘শুরুতে যখন সিঁড়ি ডাবাইছে তখন একটা সিঁড়ি কিছুদূর যাওয়ার পরে ভাংগি গেইছলো। সেটা আর ডাবায় নাই। তখন হামরা কইছনো। ওমরা কইছে নীচোত পাথর আছে সেই জন্যে আর ডাবে না।’

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তফছিরা চৌধুরী বলেন, ‘বিল্ডিং এর কাজ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। আর অফিসিয়ালি ভাবে বিল্ডিং হস্তান্তর করা হয়েছে এ মাসের গত ১৪ তারিখে। তবে এ বিল্ডিং এ উঠার আগ থেকেই এ ফাটলগুলো ছিলো। সে কারণে র‍্যালিং সিঁড়িটা বন্ধ রেখেছি। ছোটো বাচ্চা কখন কোন দুর্ঘটনা ঘটে। বিষয়গুলো নিয়ে আমি একাধিকবার ইঞ্জিনিয়ার অফিসের তপন স্যার, মিলন স্যার এবং ঠিকাদারকে বলেছি। তারা খালি বলেন আসতেছি। কিন্তু আসেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘তখন আমি সহকারী শিক্ষক ছিলাম। তারপরেও মাঝে মধ্যেই কাজ দেখতে এসেছিলাম। বলেছিলাম কাজে অনিয়ম হচ্ছে। কিন্তু কোনো গুরুত্ব দেননি তারা। পরে দেখা যায় তৎকালীন হেড স্যার আমাকেই বকা দিতেন। কোনো আমি এ বিষয়ে কথা বলি।’

এ বিষয়ে বেলকা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাওলানা মো. ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ বলেন, ‘বিল্ডিং এর বিভিন্ন অংশে ফাটল হয়েছে বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানলাম। তবে কাজটা শুরু করার পরে কয়েকবার গিয়েছিলাম। তখন কাজে অনিয়ম দেখে এলজিইডি অফিসে কথাও বলেছিলাম। তারা কেনো জানি গুরুত্ব দেননি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিল্ডিংয়ের কাজটি শেষ করতে অনেক সময় লাগিয়েছেন তারা। এ নিয়েও বারবার কথা বলেছি তাদের সাথে। তারা যাতায়াত ব্যাবস্থা ভালো না বলেই সময় পার করেছেন।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পলাশ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী প্রিতম এবিষয়ে নিউজ করতে নিষেধ করেন। নিউজ হলে তাদের রেপুটেশন খারাপ হওয়ার কথাও তিনি বলেন।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘কেউ আমাকে জানায়নি। আপনার মাধ্যমে জানলাম। খোঁজ নিয়ে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে কথা হয় কাজটি তদারকির দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী প্রকৌশলী কাজী মাহবুবুর রহমান মিলনের সাথে। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কাজে হেয়ার ক্রাক হয়ে থাকে অনেক সময়। কিউরিন খারাপ হলে এ ধরনের সমস্যা হয়। তবে এতে ভয়ের কোনো কারণ নেই। তারপরেও বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি। সে রকম হলে আবারও ঠিক করে দেয়া হবে।’

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী তপন কুমার চক্রবর্তী এ বিষয়ে কোনো মতামত দিতে রাজি হননি।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close