কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল ১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এখন নিজেই যেন ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়েছে। তীব্র তাপদাহের মধ্যে ভয়াবহ লোডশেডিং এবং হাসপাতালের নিজস্ব জেনারেটর বিকল থাকায় রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে, ফলে সুস্থ হতে এসে উল্টো নতুন করে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন রোগীরা।
সরেজমিনে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায় এক মানবেতর চিত্র। দিন-রাত মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার বড় একটি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। লোডশেডিং শুরু হলেই ওয়ার্ডগুলোতে রোগীদের আর্তনাদ শোনা যায়। তৃতীয় ও চতুর্থ তলার শিশু, মহিলা ও পুরুষ ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, প্রচণ্ড গরমে রোগীরা ঘেমে একাকার হয়ে গেছেন। হাতপাখাই এখন তাদের একমাত্র ভরসা। যাদের পাখা নেই, তারা খবরের কাগজ বা কাপড়ের আঁচল দিয়ে বাতাস করছেন। অনেকে অসহ্য গরমে ওয়ার্ড ছেড়ে বারান্দা কিংবা করিডোরে পায়চারি করছেন একটু শীতল বাতাসের আশায়।
বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিশু ও শ্বাসকষ্টের রোগীরা। জেনারেটর অকেজো থাকায় লোডশেডিং চলাকালীন নেবুলাইজেশন সেবা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে শিশুদের বুকফাটা কান্না এবং বড়দের শ্বাসকষ্টের তীব্রতায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। নার্স ও কর্তব্যরত চিকিৎসকরাও গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছেন, যা তাদের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে রাতে হাসপাতালের ভেতরে অন্ধকার নেমে আসে, ফলে নারী ও শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
পাকুন্দিয়া উপজেলার শিমুলিয়া গ্রাম থেকে আসা বিলকিস আক্তার তার কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, “দুই দিন ধরে ৮ বছরের মেয়েকে নিয়ে ভর্তি আছি। দিন-রাতে অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। গরমে মেয়েটা সারাক্ষণ কান্নাকাটি করে। হাতপাখা দিয়ে কতক্ষণ বাতাস করা যায়? আমরা এখানে চিকিৎসা নিতে এসেছি, নাকি কষ্ট করতে?”
পৌর এলাকার কামারকোনা থেকে আসা রোগী নাঈম মিয়া বলেন, “বিদ্যুৎ গেলে শরীর থেকে বৃষ্টির মতো ঘাম ঝরে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। হাসপাতালের এমন অবস্থা হলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? দ্রুত জেনারেটর ঠিক করা দরকার।”
আচমিতা ইউনিয়ন থেকে আসা রোগী শরিফ জানান, হাসপাতালের গরমে টিকতে না পেরে শেষমেশ বাড়ি থেকে চার্জার ফ্যান আনিয়েছেন। তিনি বলেন, “একবার বিদ্যুৎ গেলে আসার নাম থাকে না। এই গরমে ফ্যান ছাড়া থাকা মানে সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করে ফেলা।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, একটি সরকারি হাসপাতালে জেনারেটর বিকল থাকা এবং বিকল্প ব্যবস্থা না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এবং রোগীদের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত সরকারি বরাদ্দ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বিদ্যমান সংকটের বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ঈসা খান বলেন, “আমাদের হাসপাতালের জেনারেটরটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল। মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় আমরা বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে পারছি না। বর্তমানে আইপিএসের মাধ্যমে কেবল কিছু বাতি জ্বালানো সম্ভব হচ্ছে, কিন্তু ফ্যান বা ভারী চিকিৎসা যন্ত্রপাতি চালানো সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, “লোডশেডিংয়ের সময় হঠাৎ কোনো রোগীর শ্বাসকষ্ট হলে নেবুলাইজেশন দেওয়া যাচ্ছে না, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতা ও দুর্ভোগের কথা জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করেছি। বরাদ্দ পেলে দ্রুত জেনারেটর মেরামত বা নতুন জেনারেটরের ব্যবস্থা করা হবে।”
কেকে/এলএ