জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের যোগদানকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে সাবেক যুবদল নেতা মোহাম্মদ ইসহাক সরকারের এনসিপিতে যোগদানকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নানা অভিযোগ রয়েছে। ইসহাক সরকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে ঢাকা-৭ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন। এ ঘটনায় তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কারের পর থেকেই তিনি এলাকায় নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন।
গত শুক্রবার প্রায় তিন হাজার নেতাকর্মী নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে যোগ দেন ইসহাক সরকার। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যে ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগে আলোচিত, তাকে দলে নেওয়া এনসিপির নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা।
এর আগে এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, অতীতে কেউ ছাত্রদল, ছাত্রশিবির বা ছাত্রলীগ করুক—তা তাদের কাছে মুখ্য নয়। তবে ফ্যাসিবাদে অংশগ্রহণকারী, গণহত্যায় জড়িত, চাঁদাবাজ বা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কেউ এনসিপিতে স্থান পাবেন না। রাজধানীর বাংলামোটরে দলটির অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। কিন্তু ইসহাক সরকারের যোগদানের পর সেই বক্তব্য নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।
পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও ইসহাক সরকারের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, চাঁদাবাজির দ্বন্দ্বের জেরেই সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, যার নেপথ্যে ছিল প্রভাব বিস্তারের লড়াই।
স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওই এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলত যুবলীগ-ছাত্রলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। সরকার পতনের পর সেই নিয়ন্ত্রণ নেয় বিএনপি নেতা ইসহাক সরকারের বলয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাসিক ছয় লাখ টাকা করে চাঁদা আদায় করতেন। সোহাগ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সেই টাকা সংগ্রহ করে তার কাছে পৌঁছে দিতেন। এর মধ্যেই চাঁদার পরিমাণ বাড়িয়ে ১২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে সোহাগকে সরিয়ে মাহমুদুল হাসান মহিনকে চাঁদা তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিষয়টি জানার পর সোহাগ স্থানীয় আরেক বিএনপি নেতা হামিদুর রহমান হামিদের গ্রুপে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।
অভিযোগ রয়েছে, ইসহাক সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী মহিন গ্রুপের লোকজন ওই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। পরে নিহত সোহাগের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, সোহাগ দীর্ঘদিন এলাকায় ব্যবসা করায় ব্যবসায়িক আধিপত্য, প্রভাব বিস্তার এবং আর্থিক বিরোধ নিয়ে আসামিদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব চলছিল। এর জের ধরে তার গুদাম তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাকে এলাকা ছাড়ার জন্য ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই বিরোধই হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া কোনো দল যদি বিতর্কিত, বহিষ্কৃত ও অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত নেতাদের দলে টানে, তবে জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। বিশেষ করে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া দলগুলোর জন্য এটি বড় ধরনের নৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগদান অনুষ্ঠানেই সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার। তিনি বলেছেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা এই দিন পেয়েছি, কথা বলার অধিকার পেয়েছি। যদি দেখি বর্তমান শাসকগোষ্ঠী আবার একইভাবে ফ্যাসিবাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তবে আমরা আবার রাজপথে নেমে আসব। আপনাদের পতন ঘটাতে আমরা বেশি সময় নেব না। তিনি বলেন, সরকারকে আহ্বান করব—গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিন, কথা বলার অধিকার ফিরিয়ে দিন, জনগণের মৌলিক ও মানবাধিকার ফিরিয়ে দিন। নতুবা আমরা রাজপথে নামতে বাধ্য হব।
গত শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দেন তিনি। যোগদান অনুষ্ঠানে বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইসহাক সরকার বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ও গণবিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাদের আমরা দেখেছি—এই ফ্যাসিবাদের পতন ঘটাতে অনেক রক্ত, অনেক ত্যাগ, অনেক জীবনের মূল্যের বিনিময়ে ৩৬ জুলাই একটি ঐতিহাসিক গণবিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমরা যখন দেখেছিলাম ছাত্ররা রাজপথে নেমে এসেছিল, তখন আমি আমার নিজের তাগিদেই সেদিন ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে রাজপথে নেমে এসেছিলাম আমাদের কর্মীবাহিনী নিয়ে। তিনি বলেন, আমি যদিও বক্তা নই, আমি একজন বিপ্লবী। জীবনের যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো আমাকে কারাগারেই থাকতে হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর বিভিন্ন মেয়াদে আমি কারাগারে ছিলাম। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে অসংখ্য সহযোদ্ধা, সহকর্মীকে হারিয়েছি। আমি দীর্ঘদিন ধরে দেখেছি—এই এনসিপির মাধ্যমেই বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র মুক্তি মিলবে। আমি মনে করি, এনসিপির মাধ্যমেই এ দেশে মুক্তির সনদ নির্দিষ্ট করা আছে।
ইসহাক সরকার আরও বলেন, আমি দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, সংগ্রাম করেছি, আন্দোলন করেছি। আমার পরিবারের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা ছিল। শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে আমাদের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে। কিন্তু আমি কোনোদিন আপস করিনি, আপস করতে শিখিনি।
রিফাত রশিদসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনুদানের তথ্য গোপনের অভিযোগ:
এনসিপি নেতা রিফাত রশিদসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনুদানের প্রায় এক কোটি টাকার তথ্য গোপন করার অভিযোগ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন নেতা। সংগঠনের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রিফাত রশিদ একাই নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। রিফাত রশিদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ছিলেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশা, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাশরাফি এবং সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক আতিক শাহরিয়ার গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সিনথিয়া জাহীন আয়েশা বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তরফ থেকে গণভোটের পক্ষে দেশব্যাপী প্রচার চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রচারের অর্থায়ন কীভাবে হবে—এমন প্রশ্নে তখন বলা হয়, ব্যক্তিগত খরচে এই কর্মসূচি সম্পন্ন হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে ফান্ড (তহবিল) গ্রহণ এবং তা কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, সেটি তাদের কাছে গোপন রাখা হয়েছে।
কেকে/এলএ