প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাশিত নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রংপুর সিটি করপোরেশন। দীর্ঘদিনের বাজেট বৈষম্য, অবহেলা ও পরিকল্পনার ঘাটতিতে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই নগরী এখনো আধুনিক নগরীর মৌলিক সেবাগুলো নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে ক্ষোভ জমেছে নগরবাসীর মধ্যে। তবে নতুন সরকার ও নবনিযুক্ত প্রশাসকের উদ্যোগে পরিবর্তনের আশায় বুক বাঁধছেন সবাই।
তথ্যসূত্র থেকে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২৮ জুন যাত্রা শুরু করে রংপুর সিটি করপোরেশন। পুরোনো পৌরসভার ১৫টি ওয়ার্ডের সঙ্গে নতুন ১৮টি ওয়ার্ড যুক্ত হয়ে ২০৫ দশমিক ৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ সিটি গড়ে ওঠে। ১১২টি মৌজা ও ৪৪২টি মহল্লা নিয়ে বিস্তৃত এই নগরীতে বর্তমানে নিবন্ধিত জনসংখ্যা ৮ লাখ ২৬ হাজার ৫৫২ হলেও বাস্তবে এর সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়।
আরও জানা যায়, নগরীর মোট ১ হাজার ৬৫৪ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে পাকা মাত্র ১ হাজার ২২১ কিলোমিটার—বাকি ৩৫১ কিলোমিটার সড়ক এখনো কাঁচা। তাও বিদ্যমান পাকা সড়কের প্রায় ৭০ শতাংশের অবস্থা নাজুক, ফলে প্রতিদিনই দুর্ভোগে পড়ছেন নগরবাসী।
নগরবাসী বলছেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা নগর জীবনে আরও ভোগান্তি বাড়িয়েছে। গত ১৩ বছরে নির্মিত হয়েছে মাত্র ৪৪১ কিলোমিটার ড্রেন, কিন্তু আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ২০২০ সালের একদিনের ভারী বৃষ্টিতেই প্রায় ৪২০ কিলোমিটার এলাকা জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায়—যা নগর পরিকল্পনার দুর্বলতার বড় উদাহরণ। শহরের প্রধান পানি নিষ্কাশন মাধ্যম শ্যামাসুন্দরী খালসহ বিভিন্ন খাল-বিল দখল ও দূষণে ভরাট হয়ে পড়লেও সেগুলো রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট।
সরেজমিনে দেখা যায়, যানজট এখন রংপুর নগরীর নিত্যদিনের সঙ্গী। প্রধান সড়কগুলো সংকীর্ণ, অনেক জায়গায় দখলমুক্ত নয়। এতে জরুরি সেবা থেকে শুরু করে সাধারণ চলাচল সবখানেই বাড়ছে দুর্ভোগ। নগরীতে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কোনো খেলার মাঠ না থাকাও নাগরিক জীবনের আরেক বড় সীমাবদ্ধতা। বিদ্যমান কয়েকটি মাঠও বছরের বেশিরভাগ সময় জলাবদ্ধতায় অচল থাকে।
পানীয় জলের সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। এখন পর্যন্ত মাত্র ৩২৭ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে এবং সংযোগ পেয়েছে মাত্র ৫ হাজার বাসাবাড়ি, যেখানে মোট হোল্ডিং প্রায় ৯৮ হাজারের বেশি। পাঁচটি উচ্চ জলাধারের মধ্যে চালু রয়েছে মাত্র দুটি। আয়রনমুক্ত পানি সরবরাহের তিনটি প্লান্টের মধ্যে সচল দুটি। ফলে বিশুদ্ধ পানির অভাবে ভুগছেন অধিকাংশ নগরবাসী।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ঘাটতি। প্রায় ২০ হাজার সড়কবাতি থাকলেও নগরীর অর্ধেকের বেশি এলাকা রাতের বেলায় অন্ধকারে ডুবে থাকে। অন্যদিকে, ২৩টি হাটবাজার থাকলেও সেগুলোর উন্নয়ন হয়নি—অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই চলছে কেনাবেচা।
এ পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুরের সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, “প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রংপুর সিটি করপোরেশন রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এখনো কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে রয়েছে।”
তবে আশার কথা শোনালেন সিটি করপোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন। তিনি বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নাগরিক সেবার ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।”
পর্যাপ্ত বরাদ্দ পেলে দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কেকে/এজে