মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ঝুঁকিতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:৫৭ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের হামলার আশঙ্কায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার জারি করা ‘জরুরি ও গোপনীয়’ এক চিঠিতে দেশজুড়ে নজরদারি বাড়ানো এবং নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গতকাল সোমবার জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের আটটি বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এতে হঠাৎ করেই জঙ্গিবাদের বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর কি দেশে ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে উগ্রবাদ? অন্যদিকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় পুলিশের উচ্চ সতর্কতা জারি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এনেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বেশ কয়েকজন শীর্ষ জঙ্গি জেল থেকে পালিয়ে যান। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিষয়টিতে নজর দেওয়া হয়নি। সে সময় সরকার দেশে জঙ্গিবাদের তৎপরতাকে অস্বীকার করে। এতে উগ্রবাদীরা উৎসাহিত হয়।

জঙ্গিবাদ কখনো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। তারা হারিয়ে যায় না; বরং কৌশলগতভাবে সুযোগ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নিরাপত্তার দুর্বলতার অপেক্ষায় থাকে। তাদের দীর্ঘ ‘নীরবতা’ মূলত পুনর্গঠন ও সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয়ের সময়। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা করে।

কী আছে পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠিতে: চিঠি থেকে জানা গেছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করতে পারে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন ইউনিট প্রধানের কাছে সতর্কবার্তা পাঠায় পুলিশ সদর দপ্তর। ওই বার্তায় সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদের (যিনি সামী, আবু বক্কর ও আবু মোহাম্মদ নামেও পরিচিত) সঙ্গে একটি বাহিনীর চাকরিচ্যুত দুই সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।

এদিকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশও (আরএমপি) এ বার্তার বিষয়টি স্বীকার করেছে। নির্দেশনা অনুযায়ী কেপিআই এলাকায় যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে আরএমপি মিডিয়ার মুখপাত্র উপকমিশনার গাজিউর রহমান বলেছেন, ‘আমরা যদিও কোনো থ্রেট দেখছি না, তবে কেপিআই এলাকাগুলোয় নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।’

শঙ্কা যে কারণে: দক্ষিণ এশিয়ায় সক্রিয় বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে মতাদর্শিক যোগাযোগের অভিযোগ নতুন নয়। অতীতে লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) ও জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) মতো সংগঠনগুলো আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালেবান (টিটিপি) নামের সংগঠনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, সংগঠনটির সঙ্গে একটি নিরাপত্তা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের একটি ঘাঁটি থেকে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর (বিএএফ) এক ওয়ারেন্ট অফিসারের সন্ধান মিলেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) একটি ডেরায়। এ ঘটনার পর সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্রপন্থি নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশে টিটিপির উপস্থিতি নতুন নয়। ২০১৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল—ওই বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে তিন টিটিপি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এমনকি গত বছর পাকিস্তানের সামরিক অভিযানে অন্তত চারজন বাংলাদেশি টিটিপি যোদ্ধা হিসেবে নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

জঙ্গিবাদের এই সাম্প্রতিক উত্থানের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে অনেক দুর্ধর্ষ জঙ্গি সদস্য পালিয়ে যায়। পুলিশ সদর দপ্তরের ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্যানুযায়ী, কারাগার ভেঙে পালানো ২০২ জন বন্দির মধ্যে ১৩৩ জনই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও আইজিপি বারবার বলেছেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন বক্তব্য আসার পর মাঠপর্যায়ে আমাদের করার কিছু থাকে না।’

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, বিগত সরকারের পতনের পর পাকিস্তানের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়া এবং মানুষের ঘনঘন পাকিস্তান ভ্রমণের বিষয়টিও বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের একজন প্রভাবশালী নেতার বাংলাদেশ সফর এবং সে বিষয়ে সরকারের নীরবতা নিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এবং সরকারের পক্ষ থেকে ‘অস্বীকার করার সংস্কৃতি’ জঙ্গিবাদের এই নতুন উত্থানকে উসকে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘ঘটনাটির গুরুত্ব কেবল বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।’ তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে উগ্রবাদী প্রভাব তৈরি হলে তা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সম্ভাব্য যে কোনো সশস্ত্র বা উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদর দপ্তরের জারি করা সতর্কতা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটিকে হঠাৎ কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জঙ্গিরা এই মুহূর্তে নতুন করে জন্ম নেয়নি; তারা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যবস্থার ভেতরে বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান ছিল।’

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জঙ্গি তৎপরতা প্রতিরোধে বাংলাদেশ পুলিশ সবসময়ই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে জামিনে মুক্তি পাওয়া বেশ কয়েকজন জঙ্গি সন্দেহভাজনকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অনেককে নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।’

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ঝুঁকি   রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close