মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ নবায়নযোগ্য জ্বালানি
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:১৯ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের নীতিগত ঘোষণা ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে কাঠামোগত জটিলতা, অর্থায়ন সংকট ও নীতিগত অনিশ্চয়তায় খাতটি বড় ধরনের আস্থার সংকটে পড়েছে। বাজারে প্রবেশের বাধা, প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং চুক্তিগত নিরাপত্তাহীনতার কারণে সম্ভাবনাময় এ খাতের অগ্রগতি কার্যত থমকে আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ অব্যবহৃত সরকারি জমিতে সৌর প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে চতুর্থ বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফোরামের সেমিনারে এসব কথা বলা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষক আবরার আহমেদ ভূঁইয়া। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে সিপিডি জানায়, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ইতিবাচক উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতা যেমন জরুরি, তেমনি নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সংস্থাটির মতে, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, বহুমুখী অনুমোদন প্রক্রিয়া, উচ্চ সুদের হার এবং বৈদেশিক ঋণ পেতে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই বিনিয়োগ ব্যয় বাড়াচ্ছে। বিনিময় হার ঝুঁকি ও কর-সুবিধা বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতাও খাতটিকে দুর্বল করছে।

সিপিডি জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে প্রায় ৫.৬৮ গিগাওয়াট ক্ষমতার ৩১টি সৌর প্রকল্পের লেটার অব ইন্টেন্ট (এলওআই) বাতিল করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের সম্ভাব্য বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হয়েছিল এবং ১৫টি কোম্পানি জমি কিনেছিল।
এ ছাড়া ইমপ্লিমেন্টেশন এগ্রিমেন্ট (আইএ) ধাপে ধাপে বাতিল করা হয়েছে, কিন্তু এর বিকল্প হিসেবে নির্ভরযোগ্য পেমেন্ট সিকিউরিটি ব্যবস্থা চালু করা হয়নি। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন বেসরকারি বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।

আরও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সার্বভৌম গ্যারান্টি রক্ষা না করা। অন্তত তিনটি প্রকল্প, যেগুলো এডিবি ও জাইকার অর্থায়নে অনুমোদিত ছিল (মোট প্রায় ২১০ মিলিয়ন ডলার), সেগুলো স্থগিত হয়ে গেছে। কারণ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী সরকারের দেওয়া গ্যারান্টি বজায় রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, বিশেষ করে ট্যারিফ-সংক্রান্ত উদ্বেগ দেখিয়ে।

জমি অধিগ্রহণই প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক বলে মনে করছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, জমির মালিকদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা, জমির শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বিরোধ এবং সরকারি দায়িত্বের অস্পষ্টতা প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়েই সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এ ছাড়া পরিবেশগত ছাড়পত্র, ব্যবসা নিবন্ধন ও লাইসেন্সিংয়ের মতো অনুমোদনগুলো ধারাবাহিকভাবে নিতে হওয়ায়, বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিলম্ব আরও বাড়ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য আলাদা বিনিয়োগ-সহায়তা সেল না থাকায় একক যোগাযোগ কেন্দ্রের অভাবও বিনিয়োগে নিরুৎসাহ তৈরি করছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও জ্ঞান বিনিময়ের কাঠামো দুর্বল থাকায় বিদেশি অভিজ্ঞতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

দেশীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার (১২–১৩ শতাংশ) স্থানীয় অর্থায়নকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। অন্যদিকে বিদেশি ঋণ পেতে জটিল যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া বিনিয়োগ ব্যয় বাড়াচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ) ও টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (টিডিএফ) থাকলেও এগুলো সীমিত পরিসরের এবং ব্যবহার জটিল।

কর-অবকাশের ঘোষণাও বাস্তবে পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সময়সীমা, ধাপে ধাপে কর ছাড় কমে যাওয়া এবং পুনঃবিনিয়োগের শর্ত বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প চলাকালেই নীতিমালা পরিবর্তনের কারণে ঘোষিত কর-সুবিধা পাওয়া যায়নি।

নীতিগত অনিশ্চয়তা ও সমন্বয়হীনতায় আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। একাধিক সংস্থার অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সমন্বয়ের অভাব প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত করছে। বেশির ভাগ প্রক্রিয়া এখনো কাগজনির্ভর হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য জটিলতা আরও বাড়ছে। চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ ক্রয়মূল্য পুনঃনির্ধারণের ঘটনাও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে অর্থ পরিশোধ—কিছু ক্ষেত্রে ৭–৮ মাস পর্যন্ত বিলম্ব—প্রকল্পের আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সিপিডি জানায়, বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্ধেকের বেশি বিনিয়োগ চীনের। তাই বাংলাদেশ-চীন পারস্পরিক বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানো সময়ের দাবি। চীনের উন্নত ব্যাটারি ও সৌর প্রযুক্তি দেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সিপিডি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থ প্রদানের নিশ্চয়তা দিতে বিশেষ ঋণপত্র চালুর পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতিতে দ্রুত কর ও শুল্ক ছাড় দেওয়া জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে বিশেষ অর্থায়ন তহবিল গঠন করার পরামর্শ দেয় তারা। সিপিডি আরও প্রস্তাব করেছে, অকেজো বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি সৌর প্রকল্পের জন্য ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি আন্তঃসংস্থা সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়।

সিপিডি মনে করে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়; বরং সরাসরি দেশের শিল্প ও রপ্তানি সক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ থাকলে দ্রুত এ পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহ থেকে লোডশেডিং কমবে। সেই সঙ্গে দেশের পতিত সব সরকারি জমির তালিকা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এসব জমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দেওয়া হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী আরও বলেন, এখন একমাত্র সমাধান সৌরবিদ্যুৎ। তাই সব মন্ত্রণালয়ের অব্যবহৃত জমির তালিকা করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। রেলওয়ে সবচেয়ে বড় জমির মালিক; তাদের অনেক জমি পড়ে আছে—এসব বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সভায় ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সিরাজগঞ্জে ৯০০ একর জমি পড়ে আছে। এসব জমি আমরা বেসরকারি খাতে দেব। কেননা আগামী পাঁচ বছরে আমরা ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাই।

লোডশেডিংয়ের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, আমার কপাল খারাপ। দায়িত্ব নেওয়ার পরই লোডশেডিং শুরু হয়েছে। সরকারি খাতে ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া পড়ে আছে। তাই বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো তেল-কয়লা কিনতে পারছে না। তবে আগামী সপ্তাহে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হবে। লোডশেডিং ৮০০–৯০০ মেগাওয়াটে কমিয়ে আনা হবে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিদ্যুৎ খাত আগেই নাজুক অবস্থায় ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত পদক্ষেপ কার্যত এটিকে আইসিইউতে পাঠিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ৩৭টি এলওআই বাতিল করা হয়েছে, যেখানে প্রকল্পগুলো চালু রাখা বা পুনরায় আলোচনা করার কথা ছিল। এতে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সরকার এসব প্রকল্পের সম্মতিপত্র পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে দেশে মূল্যস্ফীতি আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য শক্তির কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের বর্তমান রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়ে কবে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা কেউ বলতে পারবে না। তাই নবায়নযোগ্য খাতে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি।’

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  জ্বালানি তেল   দাম   অর্থনীতি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close