‘গুজবে কান দেবেন না’ বা ‘কান নিয়া গেলো চিলে’ কথাগুলো আমাদের সমাজে বেশ প্রচলিত। কিন্তু তারপরও আমাদের জনজীবনে গুজবের বিস্তার ও এর প্রভাব এড়ানো যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক অস্থির ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক ইস্যু থেকে শুরু করে জাতীয় পরীক্ষা কিংবা অপরাধ সংক্রান্ত সংবেদনশীল ঘটনা সবকিছুকে কেন্দ্র করেই ছড়িয়ে পড়ছে গুজব ও অপতথ্য। উদ্দেশ্যমূলকভাবে তৈরি করা ভুয়া ফটোকার্ড ও বিভ্রান্তিকর তথ্য কেবল জনমনে বিভ্রান্তিই ছড়াচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা সংঘাত ও সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে। দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই অপতৎপরতা রোধ করা এখন সময়ের দাবি।
গত কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্র ও রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে টার্গেট করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে জড়িয়ে ছড়ানো ভুয়া ফটোকার্ডটি এর একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ।
ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যাওয়া প্রমাণ করে যে, একটি ছোট মিথ্যা কতটা বড় আগুনের জন্ম দিতে পারে।
একইভাবে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের গুজব পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে, তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করে।
অন্যদিকে, মির্জাপুরে উদ্ধার হওয়া মরদেহ কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের ভিডিওকে রাজনৈতিক রঙ দিয়ে প্রচার করার প্রবণতা আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অন্ধকার দিক উন্মোচিত করে। এসব অপপ্রচারের পেছনে যে একটি সুসংগঠিত চক্র সক্রিয় রয়েছে, তা এখন স্পষ্ট। তারা নেটওয়ার্কভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে সরকারকে এবং রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠছে। সাধারণ বিশ্লেষক থেকে শুরু করে ভুক্তভোগীমহল সবারই ধারণা, সরকার গুজব ঠেকাতে এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। অপতথ্য রোধে সরকারের এই শিথিলতা কেবল গুজবকারীদের সাহসই বাড়াচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল ঝুঁকি তৈরি করছে।
আমরা মনেকরি, বর্তমান ডিজিটাল যুগে কেবল আইন করে বা ইন্টারনেট বন্ধ করে গুজব ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও আধুনিক কর্মপরিকল্পনা গুজবের উৎস শনাক্ত করার পাশাপাশি সরকারি পর্যায় থেকে দ্রুততম সময়ে সঠিক তথ্য প্রচার করতে হবে। তথ্যের শূন্যতা থাকলেই গুজবের ডালপালা গজায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার ইউনিটগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া আইডি ও পেজ ব্যবহার করে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। নিবন্ধিত ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারের সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। কোনো তথ্য ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার সত্যতা যাচাই করে সরকারিভাবে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
সাধারণ মানুষকে তথ্য যাচাই না করে শেয়ার করার কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। ইতিহাসজুড়ে গুজবকে রাজনৈতিক বিপ্লবের প্রচার, ব্যক্তিস্বার্থ, ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলে কারসাজি ও নিয়ন্ত্রণ এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য সাম্প্রদায়িক উসকানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘কর্পস ফ্যাক্টরি’ গুজব কিংবা ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ সম্পর্কিত একটি গুজব ব্যাপক সুদরপ্রসারী ছিল। তবে বিষয় ও প্রবণতার দিক থেকে গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে একটি ভিন্নমাত্রয় পৌঁছেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন এখন জনপরিসর ও জনমতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক সংঘাত এড়াতে সরকারকে অবশ্যই কঠোর, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ হতে হবে। গুজব ও অপতথ্য রোধে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে বসে না থেকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। নতুবা এই ডিজিটাল অপপ্রচার ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
কেকে/ এমএস