বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, রপ্তানি কাঠামোর দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত সীমাবদ্ধতা একযোগে চাপ সৃষ্টি করছে। গত এক দশকে রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধির যে মডেলের ওপর ভর করে দেশ উচ্চ অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে, বর্তমান বাস্তবতায় সেই মডেলের স্থায়িত্ব ও সহনশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
পরিস্থিতি আর কেবল সাময়িক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে, যা অবহেলা করলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি খাত। গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি এবং তরল জ্বালানির অনিয়মিত প্রাপ্যতা দেশের শিল্প খাতকে সরাসরি আঘাত করছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় গ্যাসের ঘাটতি মানেই বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন, আর তার ফলে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান লোডশেডিং সামাল দিতে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ডিজেলের সরবরাহও যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন উৎপাদন অব্যাহত রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
ফলে উৎপাদন হ্রাস, ডেলিভারি বিলম্ব এবং রপ্তানি আদেশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানি আমদানিতে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিলম্ব ও ব্যয় বেড়েছে, যা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য সরাসরি চাপ তৈরি করছে।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী জ্বালানি না পৌঁছানোয় শিল্পকারখানাগুলো তাদের উৎপাদন পরিকল্পনা ধরে রাখতে পারছে না। এতে অর্থনীতির সামগ্রিক গতি মন্থর হয়ে পড়ছে। জ্বালানি সংকটের সরাসরি অভিঘাত পড়ছে দেশের রপ্তানি খাতে, বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পে, যা মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। এই খাতের ওপর অতিনির্ভরতা এখন একটি বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ক্ষুণ্ন হয় এবং প্রতিযোগী দেশগুলো সহজেই সেই শূন্যস্থান পূরণ করে।
সাম্প্রতিক রপ্তানি পরিসংখ্যানে প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা এবং কিছু ক্ষেত্রে নিম্নমুখী প্রবণতা এই ঝুঁকিরই প্রতিফলন। এ প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বাজারগুলোতে শুল্ক কাঠামো, শ্রমমান এবং পরিবেশগত মানদণ্ডে ক্রমবর্ধমান কঠোরতা রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রায় ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হয়, যা প্রতিযোগী অনেক দেশের তুলনায় বেশি। এ ছাড়া সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা, ট্রেসেবিলিটি এবং শ্রম অধিকার সংক্রান্ত শর্ত কঠোর হওয়ায় রপ্তানিকারকদের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ। এই উত্তরণের ফলে বিদ্যমান শুল্ক রেয়াত ও বাণিজ্য সুবিধা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার হবে, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতায় নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ- বিশেষত বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস- ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও তা বজায় রাখতে কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে শুধু কম খরচে উৎপাদন যথেষ্ট হবে না; বরং গুণগত মান, শ্রমমান এবং পরিবেশগত মান নিশ্চিত করাই হবে প্রতিযোগিতার মূল চাবিকাঠি। অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাগুলো এই চ্যালেঞ্জকে আরও তীব্র করে তুলছে।
অবকাঠামোগত ঘাটতি, উচ্চ লজিস্টিক ব্যয় এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে জট, পণ্য খালাসে বিলম্ব এবং পুরোনো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থার কারণে সময় ও ব্যয়- উভয়ই বাড়ছে। এর ফলে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। শিল্পখাতের অভ্যন্তরে সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানির ঘাটতিতে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
পরিবহন খাতে ডিজেলের সংকটের কারণে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা সরাসরি বাজারে প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব ও অনিশ্চয়তা উৎপাদন চক্রকে আরও দুর্বল করে তুলছে। এতে সামগ্রিকভাবে শিল্প খাত একটি চাপের মধ্যে রয়েছে, যা দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ- উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে বাজারে অনিয়ম ও অবৈধ মজুতের প্রবণতা বাড়ার ঝুঁকিও অস্বীকার করা যায় না। সরবরাহ ঘাটতি থাকলে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ তৈরি হয়, যা সংকটকে আরও গভীর করে। তাই জ্বালানি বাজারে কঠোর নজরদারি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অপরিহার্য। এই বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি- উভয় ধরনের কৌশল প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদে জ্বালানির অগ্রাধিকারভিত্তিক বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
শিল্প, কৃষি এবং জরুরি সেবা খাতকে প্রাধান্য দিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়। মধ্যমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও স্থিতিশীল করতে বহুমুখীকরণ জরুরি। একক অঞ্চল- বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য- নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস থেকে আমদানির পথ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি মজুত সক্ষমতা কমপক্ষে তিন মাসের পর্যায়ে উন্নীত করা প্রয়োজন, যাতে বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় তা বাফার হিসেবে কাজ করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নতুন গতি আনতে হবে। গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত- এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানি দক্ষতা উন্নত করা ভবিষ্যতের টেকসই সমাধানের অংশ হতে পারে। রপ্তানি খাতেও কাঠামোগত পরিবর্তন অপরিহার্য। তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে উচ্চমূল্য সংযোজন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ শিল্প, হালকা প্রকৌশল এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতে সম্ভাবনা রয়েছে, যা সঠিক নীতিসহায়তা পেলে দ্রুত বিকাশ লাভ করতে পারে। একই সঙ্গে নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে একক বাজারের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি কমানো যায়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায়ও সংস্কার জরুরি। আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
সবশেষে, বর্তমান সংকটকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। এটি আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতা, অতিনির্ভরতা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। সঠিক সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এই সংকটই হতে পারে একটি মোড় পরিবর্তনের সুযোগ- যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি আরও বহুমুখী, স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে শিল্পায়ন টেকসই হয় না- এ সত্য এখন আর তাত্ত্বিক নয়, বরং কঠিন বাস্তবতা। এখন প্রয়োজন দ্রুত, সমন্বিত এবং সাহসী নীতিনির্ধারণ; কারণ আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক স্থিতি ও সক্ষমতা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
কেকে/ এমএস