মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
জঙ্গি আছে, জঙ্গি নেই
শিপার মাহমুদ
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৫৪ এএম আপডেট: ২৯.০৪.২০২৬ ১২:০৬ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের হামলার আশঙ্কায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হয়। এ ছাড়া একই আশঙ্কায় দেশের আটটি বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়। এতে হঠাৎ করেই জঙ্গিবাদের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। জনমনে প্রশ্ন জাগে, তবে কি দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে জঙ্গি গোষ্ঠী? এ নিয়ে সরব হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গনও।

তবে দেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নিয়ে সরকারের মধ্যে ও বাহিনীগুলোর মধ্যেও ভিন্ন মত দেখা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলছেন, দেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, দেশে জঙ্গি রয়েছে। এদিকে পুলিশ সদর দপ্তর জঙ্গি হামলা বিষয়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করলেও, এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছে আরেক বাহিনী র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে জঙ্গিবাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। ‘ওই শব্দটিকেই (জঙ্গিবাদ) আমরা এখন আর রিকগনাইজ করি না। আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো তৎপরতা নেই। কিছু এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ সব দেশেই থাকে, কিছু রেডিক্যাল বা ফান্ডামেন্টাল রাজনৈতিক শক্তি থাকে—এগুলো স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জঙ্গিবাদের কোনো অস্তিত্ব নেই।’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ নজরদারি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বে সব দেশেই প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে নিজস্ব ইন্টেলিজেন্স উইং থাকে। কোনো সদস্য দেশবিরোধী বা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখতে মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স কাজ করে। এ ধরনের ঘটনায় প্রচলিত সামরিক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যা নতুন কিছু নয়।

এদিকে গতকাল প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিটেন্সি—জঙ্গিবাদ ছিল, আছে। তবে জনগণকে এটুকু বলতে চাই—এই ঝুঁকি এমন নয় যে, এটার জন্য ভয় পেতে হবে। কিন্তু সেই পুরোনো কথা, আমরা যদি কোনো একটা সংকটকে বা ডিজিজকে স্বীকার না করি, ওটার চিকিৎসা হবে না। সো, ইটস দেয়ার; আমরা এটাকে একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করব।’

তবে গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. খালিদুল হক হাওলাদার বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার সম্ভাব্য হুমকির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তবে যে কোনো ঝুঁকি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এ মুহূর্তে এমন কোনো থ্রেট দেখছি না। তবে যে কোনো সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় আমাদের ডিপ্লয়মেন্ট রয়েছে। আমরা আশা করি, অপরাধীরা এ ধরনের সাহস করবে না।’

খালিদুল হক হাওলাদার আরও বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও জনসাধারণ-সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র‌্যাবের টহল ও অভিযান কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

জঙ্গিবাদের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সরকারের মধ্যে ও বাহিনীগুলোর মধ্যে বিপরীতমুখী বক্তব্য জনমনে আতঙ্ক তৈরি করে বলে মনে করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, ‘জননিরাপত্তা বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মধ্যে এ ধরনের স্ববিরোধী বক্তব্য বা সমন্বয়হীনতা বেশ গুরুতর। নাগরিক হিসেবে আমরা উদ্বিগ্ন হই। এটা আমাদের আতঙ্কিত করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখছি, গত কয়েক দিন ধরে বিমানবন্দরসহ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গরা যখন এর বিপরীত কথা বলেন, তখন বোঝা যায় তাদের মধ্যে গুরুতর সমন্বয়হীনতা ও তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে পরস্পরবিরোধী কথন বন্ধ করা দরকার।’

এর আগে গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছিল, ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা’ জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। এরপর দেশের বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জারি করা চিঠিতে বলা হয়, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করতে পারে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন ইউনিট প্রধানের কাছে সতর্কবার্তা পাঠায় পুলিশ সদর দপ্তর। ওই বার্তায় সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদের (যিনি সামী, আবু বক্কর ও আবু মোহাম্মদ নামেও পরিচিত) সঙ্গে একটি বাহিনীর চাকরিচ্যুত দুই সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।

এদিকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশও (আরএমপি) এ বার্তার বিষয়টি স্বীকার করেছে। নির্দেশনা অনুযায়ী কেপিআই এলাকায় যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে আরএমপি মিডিয়ার মুখপাত্র উপকমিশনার গাজিউর রহমান বলেছেন, ‘আমরা যদিও কোনো থ্রেট দেখছি না, তবে কেপিআই এলাকাগুলোয় নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।’

দক্ষিণ এশিয়ায় সক্রিয় বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে মতাদর্শিক যোগাযোগের অভিযোগ নতুন নয়। অতীতে লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) ও জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) মতো সংগঠনগুলো আন্তসীমান্ত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালেবান (টিটিপি) নামের সংগঠনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, সংগঠনটির সঙ্গে একটি নিরাপত্তা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের একটি ঘাঁটি থেকে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর (বিএএফ) এক ওয়ারেন্ট অফিসারের সন্ধান মিলেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) একটি ডেরায়। এই ঘটনার পর সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্রপন্থি নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশে টিটিপির উপস্থিতি নতুন নয়। ২০১৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে তিন টিটিপি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এমনকি গত বছর পাকিস্তানের সামরিক অভিযানে অন্তত চারজন বাংলাদেশি টিটিপি যোদ্ধা হিসেবে নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

জঙ্গিবাদের এই সাম্প্রতিক উত্থানের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে অনেক দুর্ধর্ষ জঙ্গি সদস্য পালিয়ে যায়। পুলিশ সদর দপ্তরের ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্যানুযায়ী, কারাগার ভেঙে পালানো ২০২ জন বন্দির মধ্যে ১৩৩ জনই এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  জঙ্গি   আছে   বাংলাদেশ   বিএনপি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close