বাংলাদেশে গত দেড় দশকে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের মতো ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় সহায়তায় ব্যাংক দখল ও অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল গুটিকয়েক প্রভাবশালী গোষ্ঠী, যার মধ্যে এস আলম গ্রুপ অন্যতম।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ’ প্রণয়ন করলেও পরবর্তীতে এতে আনা সংশোধনী এবং সংসদে আইনটি পাস হওয়ায় নতুন করে বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে এ আইনের মাধ্যমে অতীতের লুটের টাকা আদায় হবে, নাকি নতুন করে লুটপাটের পথই প্রশস্ত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, অর্থপাচার ও বেড়ে ওঠা খেলাপি ঋণের চাপে দুর্বল হয়ে পড়া শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসিকে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে একটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠন করা হয়।
গত ১১ এপ্রিল সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন’ বিল নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলাকালেই দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ থেকে বের হয়ে শেয়ারের মালিকানা পুনরুদ্ধারের আবেদন করেছেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির (এসআইবিএল) সাবেক পাঁচ পরিচালক।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া এই আবেদনে তারা শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটিকে আবার আলাদা করে পরিচালনার অনুমতি চেয়েছেন এবং আবেদনে আগামী ১০ বছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ‘ব্যাংক রেট’ এর সুদহারে ১১ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তাও চাওয়া হয়েছে। আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালক ও সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল হক, যিনি ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
একীভূত হওয়ার আগে সর্বশেষ পরিচালনা পর্ষদেও তিনি ছিলেন এবং ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর পদত্যাগ করেন।
রেজাউল হক বলেছেন, ব্যাংক পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন জোগাড় করার সক্ষমতা আছে। ব্যাংক ঠিক করতে যে পরিমাণ মূলধন দরকার, তা আমরা ব্যবস্থা করতে পারব। আমরা আমাদের পরিকল্পনা জানিয়েছি। আরেক সাবেক পরিচালক জাবেদুল আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, সদ্য পাস হওয়া ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী তারা এ আবেদন করেছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিগত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের অনেক ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে নানামুখী চাপ ও সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েন। নীতিগত অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে একটি বড় অংশের উদ্যোক্তা সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিশেষ করে ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন। নতুন কাঠামোয় অতীতে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর ফের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পুনরায় শক্ত অবস্থান তৈরি হবে, অন্যদিকে নতুন ও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তা আরও পিছিয়ে পড়বেন।
অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সংশোধিত বিধানগুলো এমনভাবে শিথিল করা হয়েছে, যা অতীতে অনিয়ম ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য আবারও ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পথ সহজ হয়েছে। তাদের মতে, যদি এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে অতীতে অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পুনঃপ্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে তা ব্যাংক খাতে ‘নৈতিক ঝুঁকি’ তৈরি করবে এবং ভবিষ্যতে নতুন করে লুটপাটের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাতটি ব্যাংক ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাংক লুট ও অর্থ পাচার করা হয়। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর ৮০ শতাংশের বেশি শেয়ার দীর্ঘ সময় ধরে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যা ব্যাংকটির করপোরেট সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। অতীতে বড় আকারের ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় লুটের অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া এখনো অনিশ্চিত। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপ-কে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে উঠে আসা অভিযোগ এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আগে যারা ব্যাংক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তারা তুলনামূলক সহজ শর্তে আবারও প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। এতে করে ইতোমধ্যে দুর্বল বা ধসেপড়া ব্যাংকগুলোর পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা আরও কমে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন সাধারণ আমানতকারীরা। কারণ ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি আরও নড়বড়ে হলে আমানতের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। ফলে কাক্সিক্ষত সংস্কারের পরিবর্তে এ সংশোধনী ব্যাংক খাতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে ‘স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টর’ ধারণার মাধ্যমে ব্যাংক পুনর্গঠনের একটি পরিকল্পনা ছিল। পরে সংশোধিত আইনের ১৮-ক ধারায় শর্তসাপেক্ষে পূর্বতন মালিকদের ফেরার সুযোগ রাখা হয়। শর্ত অনুযায়ী, সংশ্লিষ্টদের সাড়ে সাত শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিতে হবে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া সহায়তা ১০ শতাংশ সুদসহ দুবছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এসব কঠোর শর্ত বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তিনি বলেন, যেসব ব্যক্তি ব্যাংক লুটপাট বা অর্থ তছরুপের সঙ্গে জড়িত, তাদের অবশ্যই প্রচলিত আইনে বিচারের আওতায় আনা উচিত। তবে যাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই, তাদের বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, যদি তা ব্যাংক পুনরুদ্ধারে সহায়ক হয়।
অর্থপাচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সরকারের অগ্রাধিকার হলেও আইনি প্রক্রিয়ায় তা প্রমাণ করা কঠিন। তাই শর্তসাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে অর্থ ফেরত এনে দেশে পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ রাখা যেতে পারে।
তবে ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ সতর্ক করে বলেন, এতে আবারও পুরোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে এবং সৎ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। পাশাপাশি ব্যাংক যেহেতু আস্থার প্রতিষ্ঠান, তাই অতীতের বিতর্কিত মালিকদের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সব মিলিয়ে এটিকে ‘মন্দের ভালো’ একটি সমাধান হিসেবে দেখলেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সফলতা অনিশ্চিত।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর মতে, ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ এ একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীদের কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ব্যতিরেকে আবারও ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগের বিধান যুক্ত করার মাধ্যমে সরকার চিহ্নিত লুটেরাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে, এর ফলে ব্যাংকিং খাত পুনরায় দুর্নীতি ও লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে, যা আত্মঘাতীমূলক।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যথাযথ আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের জন্য দায়ী পুরোনো শেয়ার হোল্ডাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হলে, এ খাতে গুণগত কোনো পরিবর্তন আসবে না।
দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে ঘিরে নতুন করে অস্থিরতা ও দখলচেষ্টার আশঙ্কা প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে সচেতন গ্রাহক, আমানতকারী ও উদ্বিগ্ন নাগরিকদের একটি অংশ। তারা অভিযোগ করেছেন, অতীতে বিতর্কিত গোষ্ঠীর মাধ্যমে ব্যাংকটিতে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চলছে, যা আমানতকারীদের স্বার্থ ও ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকের আস্থা, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং এবং বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছিল। পল্লী উন্নয়ন, প্রবাসী আয় আহরণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাংকটির অবদান উল্লেখযোগ্য ছিল।
তবে অভিযোগ করা হয়, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। প্রক্সি পরিচালক নিয়োগ, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাংকের সুশাসন ভেঙে পড়ে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও অডিট তথ্যের বরাত দিয়ে স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়, ব্যাংকটি থেকে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন উপায়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার ফলে ব্যাংকের তারল্য, মূলধন এবং গ্রাহক আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির পরিবর্তনে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাংকটি পুনরুদ্ধারের আশা তৈরি হলেও সম্প্রতি আবারও পুরোনো গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এতে করে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্মারকলিপিতে গভর্নরের কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে অতীতে অনিয়মে জড়িত গোষ্ঠীর পুনঃপ্রবেশ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা, ব্যাংকের মালিকানা প্রকৃত মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল করা।
তাদের মতে, ব্যাংক খাতে সুশাসন ও আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় অতীতের মতো অনিয়ম ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যাবে, যা সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও বড় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
কেকে/ এমএস