প্রকৃতির রুদ্ররোষের মধ্যে বজ্রপাত এখন দেশের জন্য এক নির্মম বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। এটি এখন আর শুধু একটি ঋতুভিত্তিক প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, ধীরে ধীরে এক গভীর, জটিল এবং উপেক্ষিত জাতীয় সংকটে রূপ নিচ্ছে। প্রতিবছর এই নিঃশব্দ ঘাতকের থাবায় শত শত মানুষের প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরেই বজ্রপাতে মৃত্যু আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গতকাল বুধবারও ছয় জেলায় ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণেই বাড়ছে এ মৃত্যুর মিছিল। বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের আশঙ্কা বেড়ে যায় ১২ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ। তাপ বাড়লে বাতাসে আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে। যা শক্তিশালী বজ্রমেঘ সৃষ্টির মুখ্য জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্ষাকালের দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। ঋতুচক্রের পরিবর্তন বজ্রপাতের হার বাড়ায়। আর্দ্র ও তপ্ত বাতাসের সংমিশ্রণে বায়ুমণ্ডল অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ঘনঘন বজ্রঝড় সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে বজ্রপাতে প্রতিবছর গড়ে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। ২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করলেও এই সমস্যার সমাধানে আমাদের প্রস্তুতি এখনো অপ্রতুল।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের মানুষ বজ্রপাতে মৃত্যুকে দৈব কারণ কিংবা নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু বজ্রপাতে মৃত্যুর ক্রমবৃদ্ধি কি দৈব কারণে ঘটছে? এটিকে কি ‘নিয়তি’ বলে মেনে নেওয়া যায়?
পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করছেন এমন বিশ্লেষকরা জানান, বজ্রপাত ক্রমবৃদ্ধির কারণ বৈশ্বিক তাপমাত্রার ক্রমবৃদ্ধি। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ কোনোভাবে দায়ী নয়। দায়ী বৃহৎ শিল্পোন্নত দেশগুলো। মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের বিশ্বে এক নম্বরে রয়েছে চীন। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশ দায়ী এই দেশটি। দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১১ থেকে ১২ শতাংশ নিঃসরণ করে এ দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র মাথাপিছু কার্বন নির্গমনের শীর্ষে রয়েছে। ভারত হচ্ছে তৃতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ।
বজ্রপাতে পাঁচ জেলায় ছয়জনের মৃত্যু: বজ্রপাতে জামালপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর, শরীয়তপুর ও বরগুনায় ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল থেকে দুপুর দুইটার মধ্যে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন নারী রয়েছেন।
জামালপুরে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা হলেন ইসলামপুর উপজেলার গাইবান্ধা ইউনিয়নের মরাকান্দি এলাকার শামীম মিয়া (৩৭) এবং দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সাগর ইসলাম (১৮)। তাদের মধ্যে শামীম কৃষিকাজ করেন এবং সাগর ইসলাম নির্মাণশ্রমিক ছিলেন। পৃথক বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়। ইসলামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল কাইয়ূম গাজী বলেন, বজ্রপাতে দুজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে ময়মনসিংহের তারাকান্দায় মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে এক যুবক মারা গেছেন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত যুবকের নাম সাদ্দাম হোসেন (৩২)। তিনি তারকান্দা উপজেলার গালাগাঁও ইউনিয়নের গাবরগাতি গ্রামের মৃত হামেদ আলীর ছেলে। বাড়ির অদূরে রাংসা নদীতে সকাল সাতটার দিকে মাছ ধরতে যান সাদ্দাম হোসেন। বৃষ্টি ও বজ্রপাতের সময় মাছ ধরতে গেলে হঠাৎ বজ্রপাতে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা মরদেহটি বাড়িতে নিয়ে যান। তারাকান্দা থানার ওসি তানবীর আহমেদ বলেন, মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে ওই যুবকের বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।
বজ্রপাতে রংপুরের তারাগঞ্জে মারা গেছেন সাহেরা বেগম (৫০) নামের এক নারী। তার একটি গরু বাড়ির উঠানে আমগাছে বাঁধা ছিল। বেলা ১১টার দিকে বৃষ্টি শুরু হলে সেই গরু গোয়ালে নিতে বের হন সাহেরা। গরুটি আনতে গিয়ে বজ্রপাতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সাহেরা বেগমের বাড়ি তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের কাজীপাড়া গ্রামে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল-ইবাদত হোসেন বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। পুরো পরিবারে মাতম চলছে।
শরীয়তপুরের মারা যাওয়া ব্যক্তির বাড়ি রাজিব শেখ (৩২)। তার বাড়ি নড়িয়া উপজেলার জপসা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মাইজপাড়ায়। তিনি পেশায় জেলে ও কৃষক ছিলেন। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠিয়েছে পুলিশ।
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল কাইয়ূম বলেন, ‘আমরা মারা যাওয়া ব্যক্তির পরিবারকে প্রাথমিকভাবে সহায়তা হিসেবে ২৫ হাজার টাকা দিয়েছি। ওই পরিবারটির পাশে যে কোনো প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসন সবসময় থাকবে।’
বরগুনার আমতলীতে বজ্রাঘাতে মারা যাওয়া ব্যক্তির নাম নুর জামাল (৫৪)। তার বাড়ি উপজেলার পুজাখোলা গ্রামে। পেশায় কৃষক নুরুজামাল দুপুরে মাঠে বৃষ্টির পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রাঘাতে ঘটনাস্থলে তিনি মারা যান। পরে পরিবারের লোকজন তার মরদেহ উদ্ধার করে বাড়ি গিয়ে যায়।
পটুয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় কালবৈশাখী ঝড়ের সময় বজ্রপাতে ৪ জন নিহত হয়েছেন। একইসঙ্গে গত দুই দিনে বজ্রপাতে অর্ধশতাধিক গরুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) দিনের বিভিন্ন সময়ে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকাল ৯টার দিকে রাঙ্গাবালী উপজেলার চরগঙ্গা গ্রামে মাঠে গরু বাঁধতে গিয়ে সৌরভ মজুমদার (২২) বজ্রপাতে মারা যান। দুপুর ১টার দিকে কলাপাড়া উপজেলার তারিকাটা গ্রামে ভুট্টা ক্ষেতে কাজ করার সময় জহির উদ্দিন (২৮) নিহত হন।
এরপর দুপুর ২টার দিকে পূর্ব চাকামাইয়া গ্রামে গরুকে ঘাস খাওয়াতে গিয়ে সেতারা বেগম (৫৫) এবং একই সময়ে শান্তিপুর গ্রামে মাঠ থেকে গরু নিয়ে আসার সময় খালেক হাওলাদার (৫৫) বজ্রপাতে প্রাণ হারান। এ ছাড়া রাঙ্গাবালী ও কলাপাড়া উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় গত দুই দিনে অন্তত ৫০টি গরুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
রাঙ্গাবালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, সকালের দিকে বজ্রপাতের ঘটনাটি ঘটেছে। আর সেই বজ্রপাতেই ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এটি বজ্রপাতে স্বাভাবিক মৃত্যু। ঘটনাস্থলে আমাদের অফিসার পাঠানো হয়েছে। নিহতের পরিবার যেভাবে চাইবেন পুলিশের পক্ষ থেকে সেভাবেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে বজ্রপাত ছাড়াও কালবৈশাখী ঝড়ের আঘাতে কলাপাড়া উপজেলায় বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তালিকা করা হচ্ছে। প্রত্যেক ব্যক্তিকে সরকারিভাবে নগদ অর্থ, খাদ্য সহায়তা ও ঢেউটিন প্রদান করা হবে। এ ছাড়া গবাদিপশু মারা যাওয়া কৃষকদের তালিকা সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে নেওয়া হবে।
শহরেও বাড়ছে বজ্রপাতে মৃত্যু : ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বর্ষা এলেই আকাশে কালো মেঘ আর বজ্রপাত হতে দেখা যায়। তবে অনেকেই মনে করেন কিংবা আগে এ ধারণা সবার মধ্যে বেশি ছিল যে বজ্রপাত মূলত গ্রামাঞ্চলের দুর্যোগ। কারণ আগে খোলা মাঠে বজ্রপাতে কৃষক বা শ্রমিকরা বেশি আক্রান্ত হতেন, মারা যেতেন। তবে এখন শহরেও এর ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে উঁচু ভবন, কংক্রিটের রাস্তা, ধাতব অবকাঠামো এবং ঘন জনসমাগম বজ্রপাতের প্রভাবকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক করে তুলেছে। তাই শহুরে জীবনে বজ্রপাতের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
শহরে উঁচু ভবনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, আর এই ভবনগুলো অনেক সময় বজ্রপাতের জন্য ‘টার্গেট পয়েন্ট’ হিসেবে কাজ করে। কারণ আকাশ থেকে মাটির দিকে বিদ্যুৎ যখন নেমে আসে, তখন এটি সহজ পথ খোঁজে আর উঁচু ও ধাতব কাঠামো সেই পথকে সহজ করে দেয়। এয়ার কন্ডিশনার, মোবাইল টাওয়ার, লিফট সিস্টেম ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক স্থাপনা বজ্রপাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে।
এ ছাড়া শহরে সবুজ গাছপালা কম থাকায় বজ্রপাতের শক্তি শোষণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ভারসাম্য থাকে না। কংক্রিটের রাস্তা ও ভবনের কারণে বিদ্যুৎ সহজে ছড়িয়ে না পড়ে নির্দিষ্ট জায়গায় বেশি ক্ষতি করতে পারে। ফলে শহরে বজ্রপাত তুলনামূলকভাবে বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
বজ্রপাত নিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বার্তা : দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রসহ বৃষ্টির আশঙ্কায় জনসাধারণকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। গতকাল অধিদপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, আকাশে ঘন কালো মেঘ দেখা গেলে বা বজ্রধ্বনি শোনা মাত্রই সবাইকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। সংস্থাটি বলছে, ‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই।’
আবহাওয়া অধিদপ্তর সবাইকে সতর্ক করে পরামর্শ দিয়ে বলেছে, বজ্রধ্বনি শোনা গেলে শিশুদেরসহ পরিবারের সবাইকে ঘরের ভেতরে অবস্থান করতে হবে। এ সময় মাঠে খেলাধুলা বা ঘুড়ি ওড়ানো এবং দলবদ্ধ হয়ে অবস্থান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
বাড়িতে অবস্থান করলে দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হবে। শিলা কুড়ানো বা উঠানে থাকা যাবে না এবং জানালার গ্রিলসহ কোনো ধাতব অংশ স্পর্শ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ঘরের বাইরে থাকলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। মাটিতে শুয়ে পড়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। গাছের নিচে বা ধাতব ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নদী, হাওর বা জলাশয়ে নেমে মাছ ধরা থেকেও বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক লাইন, ধাতব বস্তু বা সংযুক্ত যন্ত্রপাতি স্পর্শ না করার নির্দেশনা দিয়েছে অধিদপ্তর।
আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানিয়েছে, বজ্রধ্বনি শোনা মানেই বজ্রপাতের ঝুঁকির মধ্যে থাকা। তাই শেষ বজ্রধ্বনি শোনার পরও অন্তত ৩০ মিনিট নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কেকে/ এমএস