মৌলভীবাজারে গত দুই দিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাতে শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গত ৩০ ঘন্টায় শ্রীমঙ্গলে ১৬০ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় জনজীবনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। শহরে মানুষজনের উপস্থিতি একেবারেই কম। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া থাকায় শহর ও আঞ্চলিক সড়কে রিকশা, অটোরিকশা ও যানবাহন কম চলাচল করতে দেখা গেছে। সেই সাথে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় শ্রীমঙ্গলেন ভ্রমণে আসা পর্যটকরা পড়েছেন বিপাকে। তারা হোটেল-রিসোর্টের রুমেই সময় কাটাচ্ছেন।
সরজমিনে দেখা গেছে, শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের পশ্চিম ভাড়াউড়া, পূর্ব শ্রীমঙ্গল, সবুজবাগ, লালবাগ, রুপসর্পু এবং আশিদ্রোন ইউনিয়নের রামনগর, গাজিপুর, মুসলিমবাগ এলাকাসহ নিম্নাঞ্চলের প্রায় শতাধিক গ্রাম তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে পশ্চিম ভাড়াউড়া এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সড়ক এবং গাজিপুর সড়ক ও কবরস্থান পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া শহরতলীর বিভিন্ন সড়ক ও নিম্নাঞ্চলে পানি জমে আছে। কোথাও হাঁটুসমান পানি জমে চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। দুইটি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক মানুষের বাসা-বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। নিচু এলাকার অনেক দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারী বৃষ্টি হলেই সদর ইউনিয়ন ও আশিদ্রোন ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়ক, প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা দিন দিন ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। গাজিপুর ও ভাড়াউড়া সড়কে প্রায় হাঁটু সমান পানি জমে থাকায় রিকশা ও সিএনজি চলাচলেও সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা।
মুসলিমবাগ এলাকার বাসিন্দা আফসার মিয়া বলেন, ‘ভারী বৃষ্টি হলেই গাজিপুর, রামনগর সড়ক ও কবরস্থান পানিতে তলিয়ে যায়। গতকালের বৃষ্টিতে অনেক স্থানে হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় কর্মজীবী মানুষদের দৈনন্দিন কাজে বের হতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বাসা-বাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকে পড়ায় প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এলাকার মানুষ।’
স্থানীয় মঈন উদ্দিন মুন্সি মুহিন বলেন, ‘সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একটানা বৃষ্টিতে শহরতলীর মুসলিমবাগ-গাজিপুর সড়ক হাঁটু পানিতে প্লাবিত হয়েছে। বাধ্য হয়ে নোংরা পানির মধ্যেই শহরে আসতে হয়েছে। এছাড়া গাজিপুর কবরস্থান ও সড়কও হাঁটু পানিতে তলিয়ে গেছে, এতে ভোগান্তি আরো বেড়েছে।’
ইজিবাইক চালক মনির মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই গাজিপুর রাস্তাটি হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায়। এতে ইজিবাইকের মোটর নষ্ট হয়ে যায়। ভাঙা রাস্তর কারণে যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার মেরামতে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে।’
সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা ঝলক দত্ত বলেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যেই দুইবার আমরা পানিবন্দি হলাম। এ যেন দুর্ভোগের এক নির্মম চিত্র। গতকাল রাতের টানা বৃষ্টি ও আজকের বৃষ্টিতে আবারও তলিয়ে গেছে রাস্তা ও বাড়িঘর। এলাকার রাস্তাগুলো যেন ছোট ছোট খালে পরিণত হয়েছে। ঘরের উঠোন থেকে শুরু করে চলাচলের পথ সবখানেই পানি আর পানি।’
সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা রুবেল আহমদ বলেন, ‘একটু বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওর্য়াডের পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রাম। গতকাল ও আজকের বৃষ্টিতেও পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। গ্রামের প্রচুর শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। জলাবদ্ধতার কারণে চলমান পরীক্ষাসহ নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার এলাকাবাসী। শহরের প্রায় ৮০ ভাগ পানি এই শাখামুড়া ছড়া দিয়ে শ্রীমঙ্গল হাইল হাওরে যাচ্ছে। কিন্তু এই ছড়া খনন দূরের কথা অনেকেই জায়গা দখল করে ছড়া সংকীণ করে রেখেছেন। পশ্চিম ভাড়াউড়া শাখামুড়া ছড়া খননসহ ভোগান্তি নিরসনে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’
সংবাদকর্মী এমএ রকিব বলেন, ‘অপরিকল্পিত বাসা-বাড়ি নির্মাণ, পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা এবং পাহাড়ি ছড়াগুলো দখল করে ভরাট করার ফলে সেগুলো সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এর ফলেই ভারী বা অতিভারী বৃষ্টিপাত হলেই তলিয়ে যাচ্ছে শহরতলীর রাস্তাঘাট, আর বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ছে ঘর-বাড়িতে।’
এদিকে, ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষিখাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে বোরো ধান ও মৌসুমি সবজি চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। জমিতে পানি জমে থাকায় ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘অবিরাম বৃষ্টিপাতের কারণে উপজেলার অধিকাংশ বোরো চাষি ক্ষতির শিকার হয়েছেন। একইভাবে মৌসুমি সবজি চাষিরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও উপজেল প্রশাসন অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
শ্রীমঙ্গলস্থ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘গত ৩০ ঘণ্টায় ১৬০ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া গত এপ্রিল মাসে মোট ৪৮৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে ২৫ এপ্রিল থেকে ৩০ এপিল্র পর্যন্ত বিৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৩১৫ মিলিমিটার রেকর্ড।’
আগামী কয়েক দিন এ অঞ্চলে বজ্রসহ ঝড় বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
কেকে/এমএ