কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেছেন, “বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে সসম্মানে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং আশা করা যাচ্ছে ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের ‘গুড বাই’ জানানো সম্ভব হবে।”
শনিবার (২ মে) বেলা ১১টায় উখিয়া উপজেলার পালংখালী স্টেশনে ‘অধিকার বাস্তবায়ন কমিটি’ আয়োজিত এক মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শাহজাহান চৌধুরী বলেন, “আগামী বছরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ দৃশ্যমান হবে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে আমরা তাদের বিদায় জানাতে পারব—ইনশাআল্লাহ।”
তিনি এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জোরালো আলোচনার আশ্বাস দেন।
তিনি আরও বলেন, “রোহিঙ্গা ইস্যু কেবল মানবিক সংকট নয়, এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।”
পাশাপাশি পাহাড় কেটে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এটি স্থানীয় পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিচালিত এনজিওগুলোর কার্যক্রমে স্থানীয় শিক্ষিত যুবকদের চাকরি নিশ্চিত করতে হবে।”
নাফ নদের বাংলাদেশ অংশে স্থানীয় জেলেদের অবাধে মাছ ধরার সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন এ সংসদ সদস্য। সেই সাথে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরকান আর্মির হাতে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্রুত ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের কথা বলেন।
৭ দফা দাবিতে স্থানীয়দের মানববন্ধন
অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজিত মানববন্ধনে কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী বলেছেন, “রোহিঙ্গা সমস্যা শিগগিরই সমাধান করা হবে, ২০২৭ সালের মধ্যে রোহিঙ্গাদের গুড বাই জানানো হবে। সরকার এ বিষয়ে তৎপর আছে, প্রধানমন্ত্রী নিজেই কমিটি করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী,পররাষ্ট্রমন্ত্রীও কাজ করছেন।”
শনিবার (২ মে) দুপুরে উখিয়ার পালংখালীতে স্টেশনে আয়োজিত উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও ক্যাম্প কেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ৭ দফা দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শাহজাহান চৌধুরী আরও বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থানীয়রা চাকরি করবে এটা আমাদের অধিকার, আজকের এই সমাবেশ থেকে আমি স্থানীয়দের আরো চাকরি ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি। নিয়মতান্ত্রিকভাবে দাবী আদায় করতে হবে।”
উক্ত মানববন্ধনের প্রধান বক্তা উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সরওয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, “রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রা আজ নিরাপত্তাহীনতায়, তাদেরকে দ্রুত প্রত্যাবাসনের জোর দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, “ক্যাম্পের চাকরির নিয়োগে অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি বন্ধে আরআরআরসি প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যাতে চাকরির ক্ষেত্রে স্থানীয়রা বঞ্চিত না হয় এবং স্বচ্ছতার সহিত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।”
অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হোছাইনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে স্থানীয়দের পক্ষে ৭ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। রবিউল হোছাইন বলেন, “রোহিঙ্গাদের কারণে আমরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবাধ যাতায়াত বন্ধ, মাদক চোরাচালান বন্ধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন, চাকরিতে ৫০ শতাংশ স্থানীয় নিয়োগ নিশ্চিতকরণের মতো জনদাবীগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের সে বার্তা পৌঁছে দিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”
অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সাত্তার আজাদের সঞ্চালনায় এসময় উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরোয়ার জাহান চৌধুরী, কক্সবাজার জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহসভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান, কক্সবাজার জেলা বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক এম.এ মোক্তার আহমদ, কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এডিশনাল পিপি অ্যাডভোকেট রেজাউল করিমসহ আরও অনেকে বক্তব্য রাখেন।
উখিয়া-টেকনাফবাসীর নিরাপত্তা ও ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে ‘অধিকার বাস্তবায়ন কমিটি’র পক্ষ থেকে ৭টি দাবি তুলে ধরা হয়।
১. ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
২. ক্যাম্প এলাকায় চুরি, ডাকাতি, মাদক, অস্ত্র চোরাচালান ও মানবপাচার রোধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা।
৩. রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে স্থানীয়দের জন্য ৫০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
৪. ক্যাম্প এলাকায় ইন্টারনেট (ব্রডব্যান্ড) ও অনলাইন জুয়া কার্যক্রম বন্ধ করা।
৫. বাঙালি ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিবাহ বন্ধনে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৬. ক্যাম্পের ভেতরে ও স্থানীয় লোকালয়ে নিরাপত্তা জোরদারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল বৃদ্ধি করা।
৭. স্থানীয়দের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ‘হয়রানিমূলক’ মামলা প্রত্যাহার করা।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে মায়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। নতুন পুরাতন মিলিয়ে প্রায় ১৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বর্তমানে বসবাস করছে।
কেকে/এজে