মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন করে উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার অশনিসংকেত দিচ্ছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই পরিস্থিতির কারণে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে রয়েছে, কারণ তেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের পরিবহন খাত, শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ পথে নিরাপত্তা ঝুঁকি, জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা ও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি হলো অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বা ‘ইঞ্জিন’, তাই এখানে যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে একটি ‘নক-অন ইফেক্ট’ বা চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করে। জ্বালানি সংকটের ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের দামে। এতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে, কারণ উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করতে হবে। সম্প্রতি জ্বালানি সংকটের কারণে যে লোডশেডিং ও জনসাধারণের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত কেনাকাটার মতো অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ফলে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির আগেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ এখন বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। আমদানিনির্ভর তেল ও গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প চালু করলে কৃষিতে ডিজেলের ব্যবহার কমবে এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। শহরাঞ্চলে ছাদভিত্তিক সোলার বাধ্যতামূলক বা প্রণোদনাভিত্তিক করলে বিদ্যুতের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
তাদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বড় আকারের সৌর পার্ক স্থাপন, সহজ ঋণ সুবিধা এবং কর ছাড় দিলে এই খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। একই সঙ্গে গ্রিড অবকাঠামো আধুনিকায়ন করে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সহজে সংযুক্ত করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব টেকসই অর্থনীতির ভিত্তিও শক্ত করবে।
বিশ্ববাজারে ইতোমধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও তরল গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে সংঘাত তীব্র হলে সরবরাহ সংকট আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশটির মোট জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলে তেল ও এলএনজি আমদানিতে চাপ তৈরি হবে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া, লোডশেডিং বৃদ্ধি এবং শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
তাদের মতে, সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় এখনই কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি জোরদার করা এবং কৌশলগত মজুত বাড়ানো। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, পাম্পে দীর্ঘ ভোগান্তির পেছনে তেল সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর গাফলতি ছিল। অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি সচিবের নির্দেশনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি।
মন্ত্রী জানান, গত দুই মাসে জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বড় চাপ। তাই বিকল্প হিসেবে সোলার এনার্জির দিকে ঝুঁকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী পাঁচ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন এবং সে অনুযায়ী কাজ এগিয়ে চলছে। এ লক্ষ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তাও চাওয়া হচ্ছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকার প্রতিটি ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের ছাদ ব্যবহার করে সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তাহলে তাদের গ্রিড বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিতে প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সোলারকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ইনসেন্টিভ দেব। আমরা ট্যাক্সের ব্যাপারটা ভাবছি—কীভাবে ট্যাক্স কমিয়ে এটা ঠিক করা যায়। যারা সোলার বেশি ব্যবহার করে, তাদের কীভাবে ইনসেন্টিভ দেওয়া যায়, সেটাও ভাবছি। আগামী জুনের মধ্যে আপনারা এ পলিসিটা পাবলিকলি দেখতে পারবেন।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, যুদ্ধবিরতির সময় সরকার জ্বালানি মজুত বাড়ানো এবং বিকল্প উৎস থেকে আমদানির কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে সংকট সামাল দিতে সহায়ক হতে পারে। ফলে আকস্মিক বড় ধরনের জ্বালানি ঘাটতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি আপাতত কম।
তবে দীর্ঘমেয়াদে তেলনির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দিয়ে শামসুল আলম বলেন, ‘তরল জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা আমি দেখি না।’ তার মতে, গ্রিড স্থিতিশীলতার যুক্তিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অপরিহার্য—এ ধারণা সঠিক নয়; বরং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা ও সরঞ্জাম স্থাপন না করায় এ নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
তিনি পরামর্শ দেন, তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ধাপে ধাপে বন্ধ রেখে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা উচিত। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিদ্যমান সক্ষমতা—প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট—পুরোপুরি কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শামসুল আলম আরও বলেন, কয়লা আমদানি, বিদ্যুৎ আমদানি এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের সমন্বয় ঘটাতে পারলে তেলভিত্তিক উৎপাদন ছাড়াই চাহিদা মেটানো সম্ভব, এমনকি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎও তৈরি হতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থায় দ্রুত রূপান্তরের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ খাতে অগ্রগতি এখনো সন্তোষজনক নয়; এখনই গতি বাড়ানোর সময়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অস্বচ্ছতা দূর করে ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে সরবরাহ ব্যয় বাড়বে, ঘাটতি বাড়বে এবং বিদ্যুতের মূল্যও বাড়বে। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ—এটাই মূল কথা।
অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, জ্বালানি হলো অর্থনীতির ইঞ্জিন। শিল্প ও সেবা খাত—সবকিছুই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি খাতের যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ‘নক-অন ইফেক্ট’ বা চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করে। বিশেষ করে নীতি নির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে। তিনি এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে একক উৎসের ওপর নির্ভর না করে উৎসের বৈচিত্র্যকরণ এবং রাশিয়ার মতো বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমান সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশকে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে হবে। সৌর শক্তির প্রসারে একটি ‘বিগ পুশ’ বা বড় ধরনের সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার এখনই সময়। এ ছাড়া জ্বালানি আমদানির উৎসগুলোতে বৈচিত্র্য আনা এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে দেশে একসময় যে অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা আবারও ফিরে আসতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তিনি জানান, সংকটের সময় দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। অনেকেই ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা ভেবে ট্যাংক ভর্তি করে তেল মজুত করার চেষ্টা করেন। এ আতঙ্কিত কেনাকাটা বা ‘প্যানিক বায়িং’ বাজারে চাপ আরও বাড়িয়ে দেয় এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সক্ষমতা অনুযায়ী চালু রাখা এবং আমদানি করা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে শিল্প ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে।
কেকে/এলএ