কিশোরগঞ্জে বোরো ধান সংগ্রহ শুরু: একদিকে উৎসব, অন্যদিকে চোখের জল
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: রোববার, ৩ মে, ২০২৬, ৫:২৭ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জ জেলায় আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে চলতি মৌসুমের বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযান। তবে সরকারি এই সংগ্রহ অভিযানকে ঘিরে যেখানে কৃষকের মুখে হাসির ঝিলিক থাকার কথা, সেখানে প্রকৃতির বিরূপ আচরণে হাওরাঞ্চলে বইছে বিষাদের ছায়া।
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির সোনালি ফসল। একদিকে ফসল ঘরে তোলার আনন্দ, অন্যদিকে সব হারানোর শঙ্কা—এই দুই বৈপরীত্যের মধ্যেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার প্রান্তিক চাষিরা।
রোববার (৩ মে) সকাল ১০টায় সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলা খাদ্য বিভাগের উদ্যোগে কিশোরগঞ্জে ধান সংগ্রহের এই কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।
স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবারও ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হচ্ছে। জেলা খাদ্য অফিস সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী জেলার ১৩টি উপজেলা থেকে সর্বমোট ১৮,৩৩০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আজ থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। প্রতি কেজি ধানের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি মণ ধানের দাম দাঁড়ায় ১,৪৪৪ টাকা। একজন তালিকাভুক্ত কৃষক সর্বোচ্চ ৭৫ মণ পর্যন্ত ধান সরকারি গুদামে বিক্রি করতে পারবেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কোনো নগদ লেনদেন করা হবে না; ধানের পুরো মূল্য সরাসরি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
ছবি : প্রতিনিধি
অন্যদিকে, হাওরে তলিয়ে গেছে ৯ হাজার হেক্টর ফসল উৎসবের আবহে বিষাদ ঢেলে দিয়েছে অসময়ের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্যমতে, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর বোরো ধানক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। মাঠের পাকা ধান যখন কাটার অপেক্ষায়, ঠিক তখনই জলাবদ্ধতায় নষ্ট হচ্ছে কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রম। অধিকাংশ জমি পানির নিচে চলে যাওয়ায় মেশিন দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না।
অন্যদিকে, হাতে ধান কাটার জন্য শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চড়া মজুরি দিয়েও মিলছে না লোক। বৃষ্টির কারণে যারা ধান কাটতে পেরেছেন, তারা পড়েছেন আরেক বিপাকে। রোদ না থাকায় ধান শুকানো যাচ্ছে না, ফলে ধানে পচন ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অষ্টগ্রাম উপজেলার কৃষক আলাল মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘বৃষ্টির পানিতে আমাদের স্বপ্নের সোনালি ধান এখন পানির নিচে। অনেক কষ্টে কিছু কাটলেও রোদ নেই, ধান শুকাব কোথায়? সরকারি গুদামে ধান দিতে হলে তো শুকনা ধান লাগে, কিন্তু এই আবহাওয়ায় তা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ধান সংগ্রহের মানদণ্ড নিয়ে কিশোরগঞ্জের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘আমরা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে কেজি প্রতি ৩৬ টাকা দরে ধান কেনা শুরু করেছি। তবে সরকারি মানদণ্ড অনুযায়ী ধানের আর্দ্রতা ও মানের বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না। কোনোভাবেই ভেজা বা নিম্নমানের ধান গুদামে নেওয়া হবে না।’
প্রকৃতির এই প্রতিকূল অবস্থায় কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন। যদিও খাদ্য বিভাগ দাবি করছে তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, তবে সাধারণ কৃষকদের দাবি—দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করে সরকার যেন ধান সংগ্রহের নিয়মে কিছুটা শিথিলতা আনে অথবা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করে। নয়তো লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও মাঠের প্রকৃত কৃষক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়বে।