স্বাধীনতার পর ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়ন ও কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের মধ্যবর্তী দুর্গম জনপদে। এ জনপদে হরিণখাইয়া খালের ওপর স্থায়ী সেতু না থাকায় চরম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ।
সম্প্রতি কালবৈশাখীর তাণ্ডব আর পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেছে স্থানীয়দের উদ্যোগে নির্মিত একমাত্র ভরসা কাঠের তক্তার সাঁকোটি। আর তাতেই যেন থমকে গেছে পুরো জনপদের জীবনচক্র। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কয়েকটি গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা—অচল হয়ে গেছে শিক্ষা, চিকিৎসা ও জীবিকার পথ।
রোববার (৩ মে) সরেজমিনে দেখা যায়, খালের দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে অসহায় মানুষজন। কেউ ঝুঁকি নিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউবা ফিরে যাচ্ছেন জীবনের প্রয়োজনীয় কাজ ফেলে। শিশুদের চোখে আতঙ্ক, নারীদের মুখে দুশ্চিন্তা আর বৃদ্ধদের চোখে অসহায়তার ছাপ স্পষ্ট।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই খালে ছিল বাইশারী ও গর্জনিয়া ইউনিয়নের একাধিক গ্রামের একমাত্র সংযোগ সেতু। গর্জনিয়ার শিয়াপাড়া, হরিণপাড়া, ঘোনাপাড়া, উত্তর থোয়াঙ্গাকাটা এবং বাইশারীর নারিচবুনিয়া এলাকার মানুষ এই পথেই যাতায়াত করতেন। এখন সেই পথ বন্ধ। ফলে তাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী ঝুঁকিপূর্ণ সেই সাঁকো পার হয়ে যেত বাইশারী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, বাইশারী দাখিল মাদ্রাসা, বাইশারী মডেল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এখন তারা কার্যত বন্দি হয়ে পড়েছে নিজ গ্রামে। অন্যদিকে, অসুস্থ রোগীদের খাল পার করা যেন এক মরণফাঁদ। অনেক ক্ষেত্রে কাঁধে বা কোলে করে ঝুঁকি নিয়ে পার করা হচ্ছে রোগী—যা যেকোনো সময় ঘটাতে পারে বড় দুর্ঘটনা।
দুই বছর আগের এক মর্মান্তিক ঘটনার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আলিমিয়া পাড়া দারুল ইহসান জুনিয়র দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী তামান্নার বাবা মো. আব্দুল খালেক।
তিনি বলেন, “আমার মাইয়া স্কুল থেইকা ফিরার পথে বর্ষার পানিতে ভেসে গেছিল। আমরা শুধু লাশ পাইছি। একটা ব্রিজ থাকলে আজ আমার মাইয়া বাঁচতো...”
একই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে শিক্ষার্থী ইব্রাহিমের বাবা মো. মোতাহের বলেন, “আমার ছেলেও ওই খালে তলায়ে গেছিল। আল্লাহর রহমতে বাঁচছে। প্রতিদিন ভয় নিয়ে থাকি—কখন কি হয়!”
স্থানীয় মো. নুরুল ইসলাম, মো. দুদু মিয়া, মো. ইউনুস, মো. আব্দুর রশিদ, ছফুরা বেগম ও রুমি আক্তারসহ অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা আর কত দিন এই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করবো? আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কি এভাবেই ঝুঁকির মধ্যে থাকবে? আমরা দ্রুত একটি পাকা সেতু চাই।”
গর্জনিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আব্দুল জব্বার বলেন, “এলাকাবাসীর যাতায়াতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মনিরুল আলম বলেন, “বিষয়টি আমার জানা আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি।’
তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ—বছরের পর বছর শুধু আশ্বাস মিলেছে, বাস্তব কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তাদের দাবি, দ্রুত একটি স্থায়ী পাকা সেতু নির্মাণ করা না হলে যে কোনো সময় আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।
কেকে/এমএ