দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। সড়ক ও মহাসড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশা, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতায় প্রতিদিনই ঝরছে প্রাণ। গত দুই দশকে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন এক লাখ ২৯ হাজার ৫১১ জন এবং আহত হয়েছেন আরও দুই লাখ ৫ হাজার ৯৪৮ জন।
বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—২০০৫ সালে তিন হাজার ৯৫৫টি দুর্ঘটনায় নিহত হন তিন হাজার ১৮৭ জন। ২০১০ সালে তা কিছুটা কমলেও পরবর্তী সময়ে আবার বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালে পাঁচ হাজার ৯৯৭টি দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় আট হাজার ৭৯৮ জনে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
২০২২ সালে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ হাজার ৯৫১ জনে, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালে নিহত হন আট হাজার ৫৪৩ জন। ২০২৫ সালে নিহতের সংখ্যা আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ১১১ জনে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬.৯৪ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালে মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ৩৭ শতাংশের বেশি ছিল মোটরসাইকেল-সংশ্লিষ্ট। একই সঙ্গে পথচারী মৃত্যুর হারও উদ্বেগজনকভাবে বেশি। চলতি বছরের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়—২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই এক হাজারের বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে; জানুয়ারিতে নিহত ৪৮৭ জন এবং ফেব্রুয়ারিতে ৪৪৭ জন।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর অভিযোগ—দলীয় সরকারের সময় দুর্ঘটনার হার বাড়ে। তাদের মতে, পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় আইন প্রয়োগে শিথিলতা দেখা যায়। ফলে বেপরোয়া চালনা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই একদিনে আরও ১৩ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সিলেটে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে এক নারীসহ ৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী এবং কুমিল্লায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে এক শিশু নিহত হয়েছে। গতকাল রোববার সকালে পৃথক এসব দুর্ঘটনা ঘটে।
সিলেটে দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দুই ভাই আজির উদ্দিন (৩৫) ও আমির উদ্দিন (২২), ধর্মপাশা উপজেলার নার্গিস আক্তার (৪৫), দিরাইয়ের সেছনি গ্রামের মোছা. মুন্নি বেগম (২৬), দিরাই ইসলামপুরের নুরুজ আলী (৬০) ও নূরনগরের ফরিদুল (৩৫), সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ থানার রায়েরগাঁওয়ের বদরুল আমিন (৪০), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের শিবপুর গ্রামের পাণ্ডব বিশ্বাস (২০) এবং পুটামারা গ্রামের বদরুজ্জামান।
আহতরা হলেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার আমকান্দি গ্রামের রফিক মিয়ার ছেলে মো. আলমগীর (৩২), সিলেট নগরীর কালিবাড়ী এলাকার মৃত শুকুর উল্লাহর ছেলে তোরাব উল্লাহ (৬০), আম্বরখানা লোহারপাড়ার মৃত আলিম উদ্দিনের ছেলে রামিন (৪০) ও একই এলাকার মল্লিক মিয়ার ছেলে আফরোজ মিয়া (৪০), সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার গাছতলা গ্রামের খোকন মিয়ার মেয়ে রাভু আক্তার (২৫), সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পুটামারা গ্রামের বদরুজ্জামানের মেয়ে হাফিজা বেগম (৩০) এবং দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়ার জফুর আলীর ছেলে রাজা মিয়া (৪৫)। আহতদের সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ভয়াবহ এই সড়ক দুর্ঘটনায় আটজন নিহত হওয়ার ঘটনায় ট্রাকচালকের তন্দ্রাকেই সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম ভূঞা বলেন, কাঁঠাল বোঝাই ট্রাকটির চালক সারারাত গাড়ি চালিয়ে সিলেটের দিকে আসছিলেন। অন্যদিকে শহর থেকে একটি পিকআপ ভ্যান শ্রমিক নিয়ে সুনামগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। তেলিবাজার এলাকায় মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই চারজন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজন মারা যান।
তিনি বলেন, ‘এটা আসলে এমন সরল একটি সড়ক, এখানে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার কথা নয়। ধারণা করা হচ্ছে, চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, কারণ তিনি রাত থেকেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন।’
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, চালকের সহকারী গাড়িটি চালাচ্ছিলেন কি না।
তবে বাংলাদেশ পুলিশ ভিন্ন দিকও খতিয়ে দেখছে। দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘এত লোডেড গাড়ি হেলপার চালানোর কথা নয়।’ পুলিশ হেলপারকে আটক করেছে। হেলপার জানিয়েছেন, চালকই ট্রাকটি চালাচ্ছিলেন। সাধারণত হেলপাররা এ ধরনের ভারী যানবাহন চালান না।
উল্লেখ্য, একই মহাসড়কে এর আগেও বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে কাছাকাছি এলাকায় আরেকটি সংঘর্ষে ১৫ শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন, যা এই সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
কেকে/এলএ