মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
তৃণমূলে তৎপরতা বাড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ
রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে, ২০২৬, ৯:২৪ এএম আপডেট: ০৪.০৫.২০২৬ ১০:৪৬ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও সম্প্রতি দলটির পক্ষে নানা কার্যক্রম সামনে আসছে। দলটির নেতাকর্মীরা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াচ্ছেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তাছাড়া আইনি ঝামেলা এড়াতে কোনো কোনো নেতাকর্মী নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে আশ্রয় নিয়ে মাঠে সক্রিয় থাকছেন। কেউ কেউ আবার মনের অজান্তে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানও দিচ্ছেন। বর্তমানে আওয়ামীপন্থি অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরাও সক্রিয় রয়েছেন। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমেই রাজনীতির মাঠে ফিরতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ।

দলীয় বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখা ও নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনুপস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ের নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। কারাবন্দি নেতাকর্মীদের জামিন এবং দলের অফিস পুনরায় খোলার চেষ্টা চলছে।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন নেতাকর্মীরা। এসব মিছিল সাধারণত রাতের আঁধারে বা ভোরবেলা অল্প সময়ের জন্য হয়, যেখানে ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’, ‘শেখ হাসিনার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’ এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়। তবে মিছিলের পর পুলিশের ধাওয়া ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে। দলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি এবং রাজনৈতিকভাবে সরব থাকার কৌশল হিসেবে এসব কার্যক্রম আয়োজন করা হচ্ছে। তবে ভয় কাটিয়ে উঠে মাঠে ফেরার এই চেষ্টা চললেও আইনি বাধার কারণে কেন্দ্রীয় নেতারা আড়ালে থেকেই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে জানা যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পুরনো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজনীতিতে ফেরার প্রচেষ্টা চালানোর বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। তবে সেটি কতখানি সফল হবে, তা নির্ভর করছে সরকারের ওপর।

সম্প্রতি দলটির পক্ষে নানা কার্যক্রম

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গত কয়েক দিনে ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি জায়গায় নানা তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। সেখানে ঝটিকা মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি সর্বশেষ গত শুক্রবার দলটির কিছু নেতাকর্মীকে শপথ গ্রহণ করতেও দেখা যায়। লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগরের একটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের এই কর্মসূচি পালনের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা আলোচনা চলছে। যেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে শপথ নিতে দেখা গেছে দলটির নেতাকর্মীদের।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একদল ব্যক্তি একটি নির্জন জায়গায় রাতের অন্ধকারে মোবাইল ফোনের লাইট জ্বালিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করছেন। ওই শপথের সময় তারা নিজেদের কালকিনি ইউনিয়ন (কমলনগর উপজেলা) এলাকার কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের পরিচয় দিচ্ছেন। তাদের বলতে শোনা যায়, শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন তারা। এ ছাড়া দেশের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করার ঘোষণাও দেন তারা। ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, শপথবাক্য পাঠ শেষে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। এ সময় তাদের ‘তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাবিতে’ও স্লোগান দিতে শোনা যায়।

এদিকে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে গত সপ্তাহে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার ও সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন কক্সবাজারের প্রায় পৌনে দুইশ আইনজীবী। তারা সেখানে দ্রুতই দলটির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য রিদুয়ান আলী বলেন, ‘এই বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি কেন ফেরানো উচিত, তা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও জাতিসংঘে পাঠানো হয়েছে। আসলে সংগঠনের রাজনীতি করার যে অধিকার আছে, সেই বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।’

নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) রাজু ভাস্কর্যের সামনে ঝটিকা মিছিল করেছে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাসহ দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। গত শনিবার সকালে তারা এই ঝটিকা মিছিল বের করেন। আটক ব্যক্তিরা হলেন স্যার এএফ রহমান হল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফারহান তানভীর নাসিফ ও মাইক্রোবাস চালক রুবেল। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সকালে ১০ থেকে ১২ জন রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জড়ো হয়ে মিছিল ও ব্যানার প্রদর্শন করেন। সংক্ষিপ্ত সময়ে কর্মসূচি শেষ করেই তারা দ্রুত একটি কালো মাইক্রোবাসে উঠে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা আরেকটি মাইক্রোবাস থেকে দুজনকে আটক করে পুলিশ। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, রাজু ভাস্কর্য এলাকায় ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল চলাকালে দুজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে নেত্রকোণা সদর উপজেলার কাইলাটি সড়কে রাতের আঁধারে হারিকেন জ্বালিয়ে ঝটিকা মিছিল করেছেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, ২০ থেকে ২৫ জন যুবক রাতের আঁধারে হারিকেন ও মোবাইল ফোনের আলো জ্বালিয়ে মিছিল করছেন। মিছিল চলাকালে বিভিন্ন স্লোগান দিতে শোনা যায়। এ ছাড়া গত শুক্রবার বরিশালের গৌরনদীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে ঝটিকা মিছিল করেছেন একদল নেতাকর্মী। মিছিলের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার ভোরে একই দাবিতে মহাসড়কের গৌরনদী বাসস্ট্যান্ডে অনুরূপ বিক্ষোভ মিছিল হয়।

এদিকে নেত্রকোণার হাওরাঞ্চল খালিয়াজুরীতে পানিতে ডুবে যাওয়া কৃষকের ধান কেটে ঘরে তুলে দিয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। গত শনিবার দুপুরে উপজেলার একটি হাওরে ধান কাটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, পানিতে ডুবে থাকা ধানখেতে ১৫ থেকে ২০ জন যুবক কর্মী ধান কাটছেন। এ সময় তারা কৃষকের দুঃসময়ে পাশে থাকার কথা বলেন। ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘ড. ইউনূসের অবৈধ নিষেধাজ্ঞা আমরা ছাত্রলীগ মানি না, মানব না।’

‘আ.লীগ কার্যক্রম চালিয়ে যাবে’

২০২৫ সালের ১১ মে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দলটির নেতাকর্মীদের কেউ কেউ মনে করেছিলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে আওয়ামী লীগ হয়তো কিছু কার্যক্রমের সুযোগ পাবে। কিন্তু নির্বাচনের পর দেখা যাচ্ছে, তেমনটা ঘটেনি; বরং বিএনপি সরকারের সময়ে এসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ-সংক্রান্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী বিলও সংসদে পাস হয়ে গেছে।

এরপর গত কয়েক দিনে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় দলটির নেতাকর্মীদের মিছিল, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতেও দেখা গেছে। এ প্রসঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার ও এর আগের অন্তর্বর্তী সরকার দলের কার্যক্রমে যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, তা দেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের সিদ্ধান্ত যাই থাকুক, আমরা আওয়ামী লীগ আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’

এই কার্যক্রমের পাশাপাশি জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারসহ আন্তর্জাতিক মহলেও তাদের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিবৃতি ও চিঠি পাঠানো হয়েছে।

বিভিন্ন কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা চললেও এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা খুব একটা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অনেক পুরনো রাজনৈতিক দল। তারা বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। ফলে তাদের ফিরে আসার প্রচেষ্টা থাকবেই—এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই সুযোগ দেবে কি না, সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।’

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  আওয়ামীলীগ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close