নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলায় শতাধিক স্থানে চলছে মাদকের আখড়া। একই সঙ্গে “এমইও” নামে পরিচিত এক ধরনের থাই জুয়াও ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন মহল্লা ও গ্রামে। এসব অবৈধ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ অনেক বেকার যুবক, যা তাদের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে বিভিন্ন সহিংসতা, পরিবারে সৃষ্টি হচ্ছে অশান্তি। এলাকাবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধির আশঙ্কা।
জানা গেছে, এক পৌরসভা ও ৯ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত চাটখিল উপজেলায় বিভিন্ন প্রকার মাদকে ছেয়ে গেছে। প্রতিটি ইউনিয়নের ১০-১২টিরও বেশি স্থানে মাদকের আখড়া রয়েছে। মাদকের মধ্যে ইয়াবা ট্যাবলেট ও গাঁজাই বেশি। এ ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসন, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। শতাধিক স্থানে ১০০-১৫০ জন মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে। এদের মধ্যে ১০-১২ জন পাইকারী ব্যবসায়ী। তারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক এনে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। মাদক ব্যবসায়ীরা স্থানীয় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসায় চালিয়ে আসছে। মাঝেমাঝে মাদকসেবী-মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হলেও তাদের কাছ থেকে যে পরিমাণ মাদক পাওয়া যায়, তা দিয়ে আদালতে চালান দিলেও ৫-৭ দিনের মধ্যে তারা জামিনে চলে আসে।
সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, পৌরসভার পৌর মার্কেটের গ্রাউন্ড ফ্লোর, মাছ ও মাংস বাজার সংলগ্ন স্থান, খোকন ভিডিও গলি, সেন্টাল হাসপাতালের সামনে, বটতলা, বদলকোট ও পাল্লা রোড, থানা সংলগ্ন চা দোকান, ভিমপুর রোড সংলগ্ন শিশু-কিশোর হাসপালের পিছনে এবং বেদে পল্লীর শাহপুর ইউনিয়নের সোমপাড়া বাজারের দক্ষিণ পাশে বাইন্না বাড়ী, শাহাপুর-শ্যামপুর সড়কের মুখে, শাহপুর উত্তর বাজার ভুতা বাড়ি, লিংক রোডের ভিতর, কলেজ রোড কিন্ডার গার্টেনের সামনের গলিতে, খিলপাড়া বালিয়াধর, শ্রীপুর, শিবপুর, দেলিয়াই বাজার থেকে ভূঁইয়া বাড়ির দরজা, শংকরপুর নয়া দাই বাড়ি থেকে চৌধুরী বাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা, ছোট জীবনগর, খিলপাড়াসহ শতাধিক স্থানে মাদকের আখড়া রয়েছে।
এছাড়া, এমইও নামের থাই জুয়ায় সর্বশান্ত হয়ে যাচ্ছে টেম্পু, অটোরিকশা, রিকশা চালক ও দিন মজুরসহ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির লোকজন। তাদের কষ্টার্জিত অর্থ এ জুয়ায় শেষ করছে। দিনে আয় করে সন্ধ্যায় জুয়া খেলে খালি হতে বাড়ি ফিরছে তারা। এ জুয়ার কারণে অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব পরিবারে অর্থের অভাবে সংকট ও ঝামেলা লেগেই থাকে।
ভুক্তভোগী অটোরিকশা চালক জহির উদ্দিনের স্ত্রী আনোয়ারা বলেন, “আমার স্বামী সারাদিন রিকশা চালিয়ে যে অর্থ উপার্জন করেন, সন্ধ্যায় জুয়া খেলে তা শেষ করে খালি হাতে বাসায় আসেন। অনেক সময় আমাদের উপবাসও থাকতে হয়।”
শাহপুর বাজারের মনির হোসেন বলেন, “আমার কলেজ পড়ুয়া ছেলে মাদকাসক্ত হয়ে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে। মাদকের টাকার জন্য তার মায়ের সাথে ঝগড়া-বিবাদ করে। মাঝেমাঝে পরিবারের বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাংচুর করে।”
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু হানিফ বলেন, “মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় এটি নির্মূল করতে হবে।”
চাটখিল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আব্দুল মোন্নাফ বলেন, “মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তাছাড়া এ ব্যাপারে প্রতি মাসে কয়টি মামলা হয়, তা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় জানানো হয়।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেন, “মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেল ও জরিমান করা হচ্ছে। এ নিয়ে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক নিয়ন্ত্রণে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে।”
কেকে/এজে