গাজীপুর জেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। পদোন্নতির আদেশ জারির পরও নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করে পুরোনো পদ আঁকড়ে থাকার অভিযোগ উঠেছে চার প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। এতে জেলার উন্নয়ন কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, ঠিকাদারদের বিল বকেয়া পড়ে আছে এবং মাঠপর্যায়ের তদারকি কার্যক্রমে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলা প্রকৌশলী (কালিয়াকৈর) থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদোন্নতি পাওয়া আব্দুল বাছেদ, উপজেলা প্রকৌশলী (কাপাসিয়া) থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হওয়া বেলাল হোসেন সরকার, সহকারী প্রকৌশলী (গাজীপুর) থেকে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) পদে উন্নীত আল-আমিন সরদার এবং সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী (গাজীপুর) থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত জামাল উদ্দিন এখনো তাদের আগের পদে বহাল রয়েছেন।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও কৃত্তিম সংকট : সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, পদোন্নতি বা বদলির আদেশ জারির পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তারা তা মানছেন না। এই পরিস্থিতিতে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কর্মস্থলে যোগ দিতে পারছেন না, উপজেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও বিল অনুমোদন আটকে আছে এবং তদারকির অভাবে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। ওই চার কর্মকর্তা আগের পদে বহাল থেকে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যত থমকে গেছে।
ষড়যন্ত্র ও ‘নীরব অসহযোগিতা’র অভিযোগ : স্থানীয় পর্যায় থেকে অভিযোগ উঠেছে, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী চক্র বর্তমান প্রশাসনের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পরিকল্পিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে রাখছে। জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি এবং সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে তারা ‘নীরব অসহযোগিতা’র কৌশল অবলম্বন করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদেশ অমান্য করার এ প্রবণতা শুধু প্রশাসনিক অবহেলাই নয়, বরং সরাসরি শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল।
তীব্র জনরোষ ও মাঠপর্যায়ের চিত্র : কাপাসিয়া ও কালিয়াকৈর এলাকার ঠিকাদার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
একজন ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘অফিস আছে, কিন্তু দায়িত্বশীল কেউ নেই। বিল আটকে থাকায় কাজ বন্ধ রাখা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’ তার মতো আরও অনেকেরই দাবি, বিল পরিশোধে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া এবং কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কাগজে-কলমে উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি দেখানো হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদ আঁকড়ে থাকার মানসিকতা এবং দায়িত্বহীনতার কারণেই মাঠপর্যায়ে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
তদন্ত ও শাস্তির দাবি : এ বিষয়ে জেলা এলজিইডি কার্যালয় থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে বিষয়টি ঘিরে জনমনে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় তদন্ত শুরু করা জরুরি।
তাদের দাবি, দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আরও ভেঙে পড়তে পারে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি উন্নয়ন কার্যক্রমে পড়বে। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে গাজীপুর জেলার চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেকে/এজে