মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
তিস্তা ঘিরে সক্রিয় ভারত
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬, ১১:৫৪ এএম আপডেট: ০৮.০৫.২০২৬ ১২:০৫ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বর্তমানে তিন দিনের চীন সফরে আছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এই রাষ্ট্রীয় সফরে দু’দেশের মধ্যে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে তিস্তা ইস্যুটিও রয়েছে। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফরের মধ্যেই তিস্তা নিয়ে মুখ খুলেছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। তিনিও জানিয়েছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী তার দেশ।

তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি অমীমাংসিত বিষয়। সমস্যাটি সমাধানে ২০১১ সালে দেশ দুটির মধ্যে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করা হলেও গত দেড় দশকে সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। এর মধ্যে চীন এ প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত অভিন্ন নদী তিস্তার বাংলাদেশ অংশে পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত একটি প্রকল্প নিয়ে নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছিল। তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে দিল্লি থেকে কোনো সমাধান না পেয়ে যতটুকু পানি পাওয়া যাচ্ছে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার ও সংরক্ষণে মনোযোগ দেয় ঢাকা।

এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে নদী খনন ও ভূমি পুনরুদ্ধারসহ নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে একমত হয় ঢাকা-বেইজিং। সেই থেকে তিস্তা নিয়ে কাজ করতে থাকে চীন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, তিস্তার পানি বণ্টন বাংলাদেশের একটি মৌলিক ভৌগোলিক ইস্যু। এর কারণে উত্তরাঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর ধরে ভোগান্তিতে রয়েছেন। শুষ্ক মৌসুমে ভারত পানি আটকে রাখায় নদীর বাংলাদেশ অংশে প্রায় প্রতিবছরই খরা দেখা দেয়। আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ছাড়ার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বন্যা ও নদীভাঙনের মতো সমস্যা। এ নিয়ে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারীসহ তিস্তা তীরবর্তী জেলাগুলোয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

এমন অবস্থায় বেশ কয়েক বছর আগে চীনের সহায়তায় একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নেয় ঢাকা। এ বিষয়ে প্রাথমিক একটি সমীক্ষাও করে বেইজিং। কিন্তু ভারতের আপত্তির মুখে প্রকল্পটির মূলপর্বের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে নির্বাচনের আগে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারেক রহমান।

তারই ধারাবাহিকতায় সরকার গঠনের দেড় মাসের মধ্যেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীন সফরে গেলেন। গত মঙ্গলবার চীনে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের ওই অঞ্চলের মানুষের বাঁচা-মরার বিষয়। এটা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার, সেই অঞ্চলের সমস্যা সুরাহা করার এবং এটা আমাদের সরকারের অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার আমরা পূরণ করব এবং চীন সফরে এই বিষয়টা আমরা নিশ্চয়ই আলোচনা করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘তিস্তা পাড়ের মানুষ বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। এটি তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়। আমরা যেভাবে পারি, যে কটি উপায় রয়েছে, সবগুলো উপায় নিয়ে কাজ করব। সবচেয়ে বড় বিচার্য বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ। বাংলাদেশ সবার আগে।’ তিস্তা নিয়ে ভারতের কাছে প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রত্যাশা থাকবে, যে চুক্তিটি হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বিবেচনায় নেওয়া যায় কি না। তবে এর জন্য তো আমরা বসে থাকতে পারি না। আমাদের কাজ আমরা করব।’

এর আগে গত সোমবার বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ভারত সফররত বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এখনো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতায় আটকে আছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি আনতে পারে কি না, সে প্রশ্নের জবাবে বিক্রম মিশ্রি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি আগে থেকে অনুমান করতে চাই না।’ তবে এ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

তিস্তা নিয়ে বৃহদায়তন প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের প্রস্তাবের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এরই মধ্যে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের নতুন সরকার চাইলে ওই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে ভারত প্রস্তুত।

গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তিটি ফলপ্রসূভাবে কাজ করেছে এবং বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমেই বিষয়টির সমাধান করা হবে। দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে উল্লেখ করে বিক্রম মিশ্রি বলেন, পানি খাতে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গঙ্গা, তিস্তা-সহ পানিবণ্টনের বিষয়গুলো নিয়ে যৌথ নদী কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কারিগরি সংস্থার বৈঠক শিগগির অনুষ্ঠিত হবে।

যা আছে মহাপরিকল্পনায় : তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে এটি ভারতের সিকিম, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতীয় অংশে এই নদীর ওপর একাধিক ব্যারেজ বা বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে ওইসব বাঁধে পানি ধরে রাখার ফলে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা শুকিয়ে যায়। ফলে নদীতীরবর্তী ফসলের মাঠে চাষাবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে পানি বেড়ে যাওয়ার ফলে একসঙ্গে সবগুলো ব্যারেজ খুলে দেওয়ায় হঠাৎ বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দেয়। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে বাংলাদেশ সরকার।

দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনার পুরো নাম ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’। সমীক্ষার মাধ্যমে ২০১৬ সালে এর প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। সমীক্ষা শেষে ২০২৩ সালে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। মহাপরিকল্পনাটির কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ অংশের উজানে একটি বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণ। সেই সঙ্গে ১০২ কিলোমিটার নদীখনন করে তিস্তার গভীরতা বৃদ্ধি, নদীর দু’পাশে ২০৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করে ভাঙন রোধ, ১৭১ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার এবং নদীর দুই তীরে স্যাটেলাইট শহর, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ১৫০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট তৈরিসহ পুরো এলাকাকে একটি পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশই আসবে ঋণের অর্থ থেকে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই নিজেদের অর্থে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ্রহ দেখিয়ে আসছে চীন। এই প্রকল্প যাচাই করতে বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার চায়না যৌথভাবে প্রায় তিন বছর ধরে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। সমীক্ষা শেষে চীন যখন আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে, তখন তিস্তা প্রকল্পে ভারতও আগ্রহ দেখায়। ২০২৪ সালের মে মাসে বিষয়টি আলোচনা করতে ঢাকা আসেন ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা। এরপর জুনে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে দিল্লি। প্রকল্পের সমীক্ষা করতে ভারতের একটি কারিগরি দল দ্রুতই ঢাকায় সফর করবে বলে শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

কিন্তু মাসখানেকের মাথায় গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে চীনের সামনে আবারও সুযোগ তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর ২০২৫ সালের মার্চে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফরে যান। তখন সরকারের তরফে বলা হয়, তিস্তা মহাপরিকল্পনাটি চীনের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন হবে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  তিস্তা   ভারত  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close