সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা      সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির শঙ্কা      বন্যার কবলে সাত জেলা : নিহত ৫৪, ছয় লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত      আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      ১৫ জুলাই সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ      সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

দেশে স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন সূচকে অগ্রগতি হলেও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই বড় সংকটে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ব্যয় পরিবারগুলোকে মারাত্মক আর্থিক চাপে ফেলছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) বলছে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো এমনভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে দরিদ্র জনগোষ্ঠী চিকিৎসা ব্যয়ের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিআইডিএসের জনসংখ্যা অধ্যয়ন বিভাগের ‘বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অপূর্ণতা এবং ব্যক্তিগত ব্যয়ে চিকিৎসার গতিপ্রকৃতি পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের রিসার্চ ফেলো ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ প্রতি মাসে স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন অনুভব করেন। কিন্তু এদের বড় একটি অংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পান না। মোট স্বাস্থ্যসেবার চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশই অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও বিপুলসংখ্যক মানুষ আর্থিক সংকট, মানসম্মত সেবার অভাব কিংবা অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে চিকিৎসা নিতে পারছেন না।

গ্রামীণ এলাকায় এ সংকট আরও প্রকট। শহরাঞ্চলে অপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবার হার ৫৯ শতাংশ হলেও গ্রামে তা ৬৮ শতাংশে পৌঁছেছে। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি অপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা দেখা গেছে নড়াইলে, যেখানে এ হার ৮১ শতাংশ। এরপর রয়েছে হবিগঞ্জ, যেখানে ৮০ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। বিপরীতে সবচেয়ে কম অপূর্ণ চাহিদা পাওয়া গেছে ফেনী জেলায়, যেখানে এ হার ১৮ শতাংশ।

গবেষণায় উঠে এসেছে, একটি বাংলাদেশি পরিবার গড়ে প্রতি মাসে স্বাস্থ্যসেবায় ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা ব্যয় করে, যা তাদের মোট পারিবারিক ব্যয়ের প্রায় ১১ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ চলে যায় ওষুধ ও রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনস্টিক সেবায়। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সমতা থাকলেও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা মূলত ধনী জনগোষ্ঠীর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। গবেষণায় বলা হয়েছে, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে। অন্যদিকে ধনী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ৫ শতাংশ। অর্থাৎ আয়ের তুলনায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেই চিকিৎসা ব্যয়ের বড় বোঝা বহন করতে হচ্ছে।

গবেষণা অনুযায়ী, গত ১২ মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মধ্যে ক্যানসার আক্রান্তদের চিকিৎসা ব্যয় ছিল সবচেয়ে বেশি। একজন ক্যানসার রোগীর গড় চিকিৎসা ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৯৩৮ টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ব্যয় সর্বোচ্চ ৮ লাখ ৪৭ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। গবেষকদের মতে, ক্যানসারের চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল ওষুধ, কেমোথেরাপি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় ব্যয় অত্যন্ত বেশি হচ্ছে।

করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় গড়ে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৭০৯ টাকা। হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় গড়ে ৯৯ হাজার ৭১৫ টাকা। এছাড়া লিভারের রোগে গড়ে ৭৮ হাজার ৯৩৪ টাকা এবং জন্ডিসে ৭৬ হাজার ৪৫৩ টাকা ব্যয় হয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট রোগে গড়ে চিকিৎসা ব্যয় হয়েছে ৬৯ হাজার ১৯১ টাকা। কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় গড়ে ৬৩ হাজার ২৭১ টাকা এবং নিউমোনিয়ায় ৫৮ হাজার ১১৭ টাকা খরচ হয়েছে।
নারীদের বিভিন্ন রোগে গড়ে চিকিৎসা ব্যয় ৪৮ হাজার ৫৬২ টাকা। দুর্ঘটনা বা আঘাতজনিত চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে ৪৪ হাজার ৩৬২ টাকা। আমাশয়ে ৪৩ হাজার ৭১৯ টাকা এবং উচ্চ রক্তচাপে চিকিৎসা নিতে গড়ে ৩৫ হাজার ৫২৯ টাকা খরচ হয়েছে।

এছাড়া নাক, কান ও গলার সমস্যায় গড়ে ৩২ হাজার ৮৪১ টাকা, পক্ষাঘাতে ৩২ হাজার ৩৬৬ টাকা এবং চোখের সমস্যায় ৩০ হাজার ৯১২ টাকা ব্যয় হয়েছে। যক্ষ্মায় চিকিৎসা ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ৫২ টাকা।

শ্বাসতন্ত্রের রোগে গড়ে চিকিৎসা ব্যয় ২৫ হাজার ৭৭১ টাকা। গর্ভধারণসংক্রান্ত জটিলতায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যয় হয়েছে ২৪ হাজার ২৩৮ টাকা। দুর্বলতা বা মাথা ঘোরার সমস্যায় ব্যয় হয়েছে ২৩ হাজার ২৫৩ টাকা।
ম্যালেরিয়ায় গড়ে চিকিৎসা ব্যয় ২২ হাজার ৩৬৫ টাকা এবং টাইফয়েডে ২০ হাজার ৭১০ টাকা। বিভিন্ন ধরনের ব্যথাজনিত সমস্যায় ১৯ হাজার ২১৮ টাকা ব্যয় হয়েছে। মৃগীরোগে চিকিৎসা ব্যয় গড়ে ১৭ হাজার ৩৪৮ টাকা। 

ডায়রিয়াজনিত সংক্রমণে ১০ হাজার ৪৭৩ টাকা এবং চর্মরোগ বা খোসপাঁচড়ায় ৯ হাজার ৮১২ টাকা খরচ হয়েছে। দাঁতের সমস্যায় গড়ে চিকিৎসা ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৪৮১ টাকা এবং জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এ ব্যয় ৭ হাজার ৭৩৫ টাকা।

গবেষণা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বিশেষ করে ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের মতো রোগে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ দ্রুত বাড়ছে। ফলে অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে সঞ্চয় ভাঙছে, ঋণ নিচ্ছে কিংবা সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

একই গবেষণায় দেশের স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থার দুর্বল চিত্রও উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) ইনডেক্স ২০১০ সালের ৩৭ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৫৪-এ উন্নীত হয়েছে। তবে একই সময়ে রোগীদের নিজস্ব পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের হার বেড়ে প্রায় ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এখনো অধিকাংশ চিকিৎসা ব্যয় সরাসরি রোগীকেই বহন করতে হচ্ছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দেশের প্রায় ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং অযোগ্য চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীলতাকে স্বাস্থ্যসেবার অপূর্ণতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, বর্তমান স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর অসম আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং চিকিৎসা ব্যয়ের আর্থিক ঝুঁকি কমাতে জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা এখন সময়ের দাবি।

সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত খরচ যত বাড়বে, সমাজে বৈষম্যও তত বাড়বে। অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ানো গেলে নিম্নআয়ের মানুষ বেশি উপকৃত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন—উভয় ক্ষেত্রেই দুর্বলতা রয়েছে। এমনকি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও বরাদ্দের অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করতে পারে না। মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের মধ্যে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক খরচের হার যত বেশি হবে, স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যও তত বাড়বে। কারণ, সমাজে আয়ের বৈষম্যের তুলনায় স্বাস্থ্য খরচের বৈষম্য আরও বেশি প্রকট। এ কারণে সরকারি স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  চিকিৎসা   মানুষ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close