মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
হাসপাতালগুলোয় বাড়ছে সন্তান হারানোর শোক
শরীফ আহম্মেদ ইমন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম আপডেট: ০৮.০৫.২০২৬ ১২:২৮ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

হাম দিনকে দিন এক ভয়াবহ মহামারির দিকেই যাচ্ছে, যা এক দশক আগেও বিজ্ঞানীরা নির্মূল করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু এখন এটি নাটকীয়ভাবে ফিরে আসছে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত ৪২ হাজারের বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আচমকা হাম সংক্রমণে প্রাণ হারাচ্ছে দেশের শিশুরা। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ১২ শিশু মারা গেছে। প্রায় নির্মূল হওয়া এই রোগটি আবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে আক্রান্ত শিশুদের ভিড়ে হাসপাতালগুলোতে তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত চাপ, বাড়ছে অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা। হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে মারা যাচ্ছে শিশুরা। আর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দিনকে দিন পরিস্থিতি মহামারির দিকেই যাচ্ছে।

হাম ও হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা) দেশে আরও ১২ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে এক শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল ১১ শিশুর। এ সময়ে সারা দেশে আরও ১ হাজার ২৩৮ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

হাম শনাক্ত হয়ে শিশুটি ঢাকায় মারা গেছে। আর হামের উপসর্গে বরিশালে ১ জন, ঢাকায় ৫ জন, খুলনায় ১ জন, ময়মনসিংহে ১ জন, রাজশাহীতে ২ জন ও সিলেটে ১ জন মারা গেছে। এর আগে ৪ মে হাম ও হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ২৭৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৫৭ শিশু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪৫ হাজার ৪৯৮ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩১ হাজার ৯১২ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ২৮ হাজার ২৩৮ শিশু বাড়ি ফিরেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে ৬ হাজার ২০৮ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

তিন হাসপাতাল ঘুরে শিশু সন্তানের মরদেহ নিয়ে ফিরলেন মা-বাবা : আমেনা বেগম চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে প্রায় অচেতন অবস্থায় বসে ছিলেন। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে আর্তচিৎকার করে বলছিলেন, ‘বাবারে কিন্তু আমি বুকে নিয়া বাসায় যামু।’ স্বজনেরা তাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আমেনা বেগম শান্ত হচ্ছিলেন না।
‘আমি তো বাবারে এমনে আনি নাই, এখন এমনে কেমনে নিয়া যামু’, ‘বাবা তো আমার কাছে আর আসব না’, ‘আল্লাহ কেন দয়া করল না’, ‘বাবা আমার আগে কেন চইল্যা গেল’, ‘বাবারে কত কষ্ট দিছি, বাবা মাফ কইরা দিয়ো’—এভাবে আক্ষেপ চলতেই থাকে মা আমেনার।

গত বুধবার সকালে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও অন্যান্য জটিলতায় মারা যায় পাঁচ মাস বয়সি মো. তাকরিম। সেখানে মা আমেনা বেগম আর বাবা মো. মহসীন একটানা বিলাপ করছিলেন। ভোলা জেলার বাংলাবাজারে তাদের বাড়ি। সকাল ১০টায় শিশুটি মারা যাওয়ার পর বেলা আড়াইটা পর্যন্ত মা-বাবা হাসপাতালেই ছিলেন। তখন তাদের সঙ্গে কথা বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না।

মো. মহসীন একসময় ফোন বের করে তার মাকে ফোন দেন। ওপাশ থেকে ফোন ধরার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলেন, ‘মা, তোমার নাতিরে আল্লায় নিয়া গেছে গো, তোমার নাতি দুনিয়া ছাইড়া চলিয়া গেছে গো, তোমার রুমে যাইয়া আর কান্না করব না তোমার নাতি।’

পিআইসিইউর (শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) দরজার একদম সামনেই ছিল তাকরিমের বিছানা। দরজার কাছ থেকেই তাকরিমের মরদেহ দেখার অনুমতি দেন চিকিৎসক। শিশুটির মরদেহ বিছানায় শোয়ানো ছিল। তখন সেখানে থাকা অন্য মায়েদের নিজের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে দেখা গেছে।

হামে মৃত্যু সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি : সরকারের কেন্দ্রীয় তালিকার তুলনায় হামে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুটি বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্যে সরকারি হিসাবের চেয়ে অন্তত আরও ৩৪ জনের হামের উপসর্গে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার পর্যন্ত ময়মনসিংহ বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে কেউ মারা যায়নি। তবে হাম আক্রান্ত হয়ে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু ময়মনসিংহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার পর্যন্ত এ বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত আরও ২৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং হামে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, উপসর্গ নিয়ে ২৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নেই কেন্দ্রীয় তালিকায়।

যোগাযোগ করা হলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মাইন উদ্দিন খান বলেন, ‘হামের উপসর্গে বিভাগের সবগুলো মৃত্যুর ঘটনা এই হাসপাতালে।’ মঙ্গলবার পর্যন্ত এ হাসপাতালে মোট ২৫ জন মারা গেছে এবং এই তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, ‘আমরা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করি। কিন্তু সরাসরি ঢাকায় সদর দপ্তরে পাঠাই না। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। তবে আমাদের তথ্য সঠিক।’

যোগাযোগ করা হলে ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ফয়সাল আহমেদ তাৎক্ষণিকভাবে সংখ্যাটি মনে করতে পারেননি। তবে তিনি তার কার্যালয়ের এক কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ওই কর্মী জানান, তারা ময়মনসিংহ মেডিকেলে সন্দেহভাজন মৃত্যুর মোট সংখ্যা সংগ্রহ করে দেখেছেন, মৃতদের মধ্যে ১২ জন ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা। সিভিল সার্জন ও ওই কর্মীর দাবি, প্রতিদিন ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে তথ্য পাঠানো হয়।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে ১১ জন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ৫ জন হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। অথচ বিভাগীয় তথ্য বলছে, গত মার্চ মাস থেকে বরিশালে ২২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ৩ জন হামে মারা গেছে। অর্থাৎ, দুই বিভাগ মিলিয়ে অন্তত ৩৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে, যা এখনো সরকারি কেন্দ্রীয় তালিকায় যুক্ত হয়নি।

বরিশাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪ জন, ভোলায় ৬ জন এবং ঝালকাঠিতে ২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। এছাড়া বরগুনায় হাম আক্রান্ত হয়ে ৩ জন মারা গেছেন বলে বিভাগীয় তথ্যে জানা গেছে।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মার্চে মোট ৮ জন, এপ্রিলে ১৪ জন এবং মে মাসে বিভাগে ৩ জন মারা গেছে।

যোগাযোগ করা হলে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক লোকমান হাকিম বলেন, ‘আমরা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সমন্বয় করি।’

এ বিষয়ে এমআইএস পরিচালক আবু আহাম্মদ আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘যোগাযোগের দুর্বলতার কারণে সংখ্যায় অমিল হতে পারে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’ তিনি আরও বলেন, ‘মৃত্যুর সংখ্যা গোপন করার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই। আমাদের ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল সেল ওয়েবসাইটে প্রতিদিন বিভাগভিত্তিক হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হয়।’

আলীকদমের দুর্গম এলাকাতেও প্রাদুর্ভাব বাড়ছেই : বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে স্থানীয় পরিবারগুলো। প্রতিদিন নতুন করে ১০ থেকে ১৫ জন শিশু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হচ্ছে।

গত বুধবার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নের পাহাড়ি ম্রো পাড়াগুলো ঘুরে দেখা গেছে, অনেক শিশু জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি ও দুর্বলতায় ভুগছে। চিকিৎসাসেবা ও নিরাপদ যাতায়াতের সংকটে অনেক রোগীকেই সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত হাসপাতালে হামসহ বিভিন্ন রোগে ভর্তি ছিলেন ১০১ জন। এর মধ্যে ৭৭ জনই হামে আক্রান্ত। এখন পর্যন্ত উপজেলায় মোট শনাক্ত হামের রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৬ জনে। একদিনেই নতুন করে ১৩ জন হাম আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ২৫ এপ্রিল থেকে গতকাল পর্যন্ত মোট ১৩৮ জন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এছাড়া বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন আরও ২৮ রোগী।

হামে আর একটি শিশুর মৃত্যুও দেখতে চাই না : জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা চাই না, হামের কারণে আর একটি শিশুও মৃত্যুবরণ করুক। সরকারকে বলব, আপনারা পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা বৃদ্ধি করুন।’

গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে এনসিপিতে নতুন সদস্যদের যোগদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  হাম    শিশু    হাসপাতাল  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close