২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে সারাদেশে ৬৪ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হলো চার দিনব্যাপী ‘শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ’ উদযাপন।
শুক্রবার (৮ মে) বিকালে ঢাকায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে এর উদ্বোধন করা হয়েছে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপ।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে তিনি বলেন, “চলমান রাজনীতির উত্তাল তরঙ্গের মাঝেও গভীর পর্যবেক্ষণ রাখার ক্ষমতা ছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। সমাজতন্ত্র আবিস্কার হওয়ার পর পৃথিবীতে যখন উতাল পাতাল হয়ে গেলো তখন তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মধ্যে যে সংকট লুকিয়ে ছিলো যা এখন প্রমাণিত তা তিনি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানীকেও বিজ্ঞানের বাইরেও যে বিশাল জগত আছে জেমস টেলিস্কোপ নিয়েও সে কথা বলে গেছেন তিনি। কবি, লেখক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যেকের বাইরেও একজন সমাজ সচেতন রবীন্দ্রনাথকে আমি স্মরণ করছি।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয় মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের, আমাদের দেশের বিস্ময় ও গৌরব। দেশের জন্য, বাঙালি জাতির জন্যও। মানবতার প্রতি, মানবতার জয়যাত্রার প্রতি তিনি অকুণ্ঠ ছিলেন এবং মানব জাতিকে উন্নীত করার ব্যাপারে তার প্রচেষ্টার শেষ ছিলো না। শিল্পে-সাহিত্যে-ধর্মে-শিক্ষায়-অর্থনীতিতে-রাজনীতিতে প্রত্যেক জায়গার তার প্রতিভার স্বাক্ষর ছিলো।’’
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “রবীন্দ্রনাথকে এড়িয়ে যাবার ক্ষমতা কোন শিক্ষিত বাঙালির নেই। শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে অনুভূতির এমন কোন জায়গা নেই, যেখানে রবীন্দ্রনাথ স্পর্শ করেননি। পাকিস্তানি আমলে রবীন্দ্রনাথের গান বন্ধ করার জন্য নানা তৎপরতা দেখা গেছে, এখনো একটা শ্রেণীর মানুষ আছে যারা সুযোগ পেলেই রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে কথা বলে। এতেই বুঝা যায় রবীন্দ্রনাথ এখনো কতটা জীবিত আছেন। আজকের এই দুঃসময়ে যখন আমরা উগ্র মৌলবাদীর উত্থান লক্ষ্য করছি, যখন আমরা একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে তাকাই তখন রবীন্দ্রনাথকে আমাদের প্রয়োজন।”
আলোচনা পর্ব শেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘হে নূতন, দেখা দিক আরবার’ গানটি সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কণ্ঠশিল্পীসহ অন্য শিল্পীবৃন্দ। এরপর আবু নাঈমের পরিচালনায় ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছো জ্যোতির্ময়’ গানের সাথে নৃত্য পরিবেশিত হয়। একক সংগীত ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান’ পরিবেশন করেন শিল্পী অনিরুদ্ধ সেনগুপ্ত এবং ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ পরিবেশন করেন শিল্পী জীবন চৌধুরী। ‘ওগো সাঁওতালি ছেলে, গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথ’ গানের সাথে অন্তর দেওয়ানের পরিচালনায় সমবেত নৃত্য পরিবেশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন ফারজানা তৃণা। এরপর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কণ্ঠশিল্পীসহ অন্য শিল্পীবৃন্দের কণ্ঠে পরিবেশিত ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ গানের সাথে সমবেত নৃত্য পরিবেশন করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নৃত্য শিল্পীবৃন্দ, নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন এসএম রাইহানুল আলম। একক সংগীত ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে’ পরিবেশন করেন শিল্পী সায়েদা হোসাইন পাপড়ি।
আনিসুল ইসলাম হিরুর পরিচালনায় সমবেত নৃত্য ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ পরিবেশিত হয়। রবীন্দ্রসংগীত ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ পরিবেশন করেন শিল্পী ছায়া কর্মকার এবং ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ পরিবেশন করেন শিল্পী নুসরাত বিনতে নূর। ‘আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ’ গানটি পরিবেশন করেন শিল্পী সুমা রাণী রায় এবং ‘কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া’ গানটি পরিবেশন করেন শিল্পী তানজিলা তমা। এরপর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কণ্ঠশিল্পীসহ অন্য শিল্পীবৃন্দ। পরিবেশন করেন রবীন্দ্রসংগীত ‘আজি দখিন দুয়ার খোলা’।
সবশেষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কণ্ঠশিল্পীসহ অন্য শিল্পীবৃন্দের কণ্ঠে পরিবেশিত ‘ঐ মহামানব আসে’ গানের সাথে ইমন আহমেদের পরিচালনায় সমবেত নৃত্য পরিবেশন করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নৃত্য শিল্পীবৃন্দ।
আগামীকাল শনিবার (৯ মে) দ্বিতীয় দিন বিকাল সাড়ে ৫টায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান থাকবেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিবমোহাম্মদ জাকির হোসেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত সংগীত, গানের সাথে নৃত্য ও আবৃত্তি পরিবেশিত হবে।
এছাড়া দেশের সকল জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে কবিগুরুর স্মরণে আলোচনা ও তার সৃষ্টিকর্ম নিয়ে নানা অনুষ্ঠানমালা পরিবেশিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত সকল অনুষ্ঠানমালা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়।
কেকে/এমএ