জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতনের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ আবারও নতুন করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলটির অঙ্গসংগঠনসহ নেতাকর্মীদের সক্রিয় করতে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন কর্মসূচি। বিশেষ করে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও তৃণমূল পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে মিছিল করতেও দেখা যাচ্ছে।
তবে এবার নতুন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এবং দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে দলটি। বিভিন্ন সূত্রের দাবি— এসব অর্থ দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও অবৈধ উপায়ে দেশ-বিদেশ থেকে প্রবেশ করছে। অর্থের জোগান দিচ্ছেন দলটির বিদেশে পলাতক সাবেক এমপি-মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় নেতা, এমনকি ১৭ বছরে দলটির সুবিধাভোগী আমলা ও ব্যবসায়ীরাও। আর সেই অর্থ ব্যবহার করে সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করা এবং নৈরাজ্য সৃষ্টির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার গঠনের খবরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্যমের সৃষ্টি হয়েছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের তিন দিকের ভারতীয় সীমান্তে বিজেপি সরকার থাকায় ভবিষ্যতে সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিকল্পিত উত্তেজনা ও অস্থিরতা সৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পার্টির সংগঠকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সাইফুল হক বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় গেলে মুসলমান সম্প্রদায়সহ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত প্রায় এক কোটি মানুষ নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হতে পারে। পাশাপাশি তাদের একটি অংশকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার অপতৎপরতার আশঙ্কাও রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ ও মুসলমানবিদ্বেষকে উসকে দিয়ে হিংসা ও ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করছে। উগ্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ দলটির প্রধান রাজনৈতিক কৌশল হওয়ায় সেখানে নিয়মিত উত্তেজনা সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন প্রসঙ্গে সাইফুল হক বলেন, এ নির্বাচন ভারতের নির্বাচনি গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে তলানিতে নামিয়ে এনেছে। রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লক্ষ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষকে নির্বাচনের বাইরে রেখে এক ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যা ভারতের ইতিহাসে নজিরবিহীন ও লজ্জাজনক। তার মতে, পশ্চিমবঙ্গসহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে নবনির্বাচিত বিজেপি নেতাদের বাংলাদেশ ও মুসলমানবিদ্বেষী উত্তেজনাকর বক্তব্য পরিহার করা উচিত।
ভারতে বসেই অর্থ জোগানের অভিযোগ : গণহত্যার দায়ে নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের কুষ্টিয়া জেলা শাখার কোষাধ্যক্ষ অজয় সুরেকার বিরুদ্ধে ভারতে অবস্থান করে দলকে সুসংগঠিত করতে অর্থ জোগানের অভিযোগ উঠেছে। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলার আসামি তিনি। ১৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখের মামলা নং-১২-এ ১৮ নম্বর, ১৯ আগস্ট মামলা নং-১৭-এ ৪ নম্বর, ২০ আগস্ট মামলা নং-১৮-এ ৪০ নম্বর এবং একই দিনে মামলা নং-২১-এ ৪ নম্বর আসামি হিসেবে তার নাম রয়েছে।
সূত্র জানায়— বাংলাদেশ ও ভারত, উভয় দেশেই প্রভাবশালী এ নেতার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। হুন্ডি লেনদেনে বিকাশ এজেন্ট ব্যবহারের কথাও জানা গেছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের ওপর হামলায় অর্থ জোগানের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে— রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা অপব্যবহার করেছেন এবং একটি প্রতিষ্ঠানকে ইচ্ছাকৃতভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন। তিনি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করলেও তার ব্যবসা কার্যক্রম সচল রয়েছে এবং সেই অর্থ দিয়ে কুষ্টিয়ায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
নাশকতায় অর্থ দেন নিক্সন চৌধুরী : নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি সফল করতে নাশকতার উদ্দেশ্যে অর্থ জোগানের অভিযোগ উঠেছে ফরিদপুর-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী ওরফে নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তার ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. ফারুক হোসেন ওরফে বোম ফারুক পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য দিয়েছেন। গত বছরের ১২ নভেম্বর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আব্দুল জলিল বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পুলিশ জানায়, কর্মসূচি সফল করতে নিক্সন চৌধুরী ফারুক হোসেনকে পাঁচ লাখ টাকা দেন। সেই অর্থের মধ্যে চার লাখ টাকা অন্য একজনকে দেওয়া হয়। এছাড়া বিকাশের মাধ্যমে বিভিন্ন নেতাকর্মীর কাছেও অর্থ পাঠানো হয়েছে। ফারুকের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণে কর্মসূচি সফল করতে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে তার যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
শিল্পমালিকদের অর্থায়নের অভিযোগ : গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা দেশ ছাড়লেও দলটির অর্থায়ন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামীপন্থি ২৬৭টি শিল্পকারখানা থেকে এখনও অর্থ জোগান দেওয়া হচ্ছে বলে শিল্প পুলিশের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কারখানার নিয়ন্ত্রণ এখনো আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হাতে রয়েছে। বিশেষ করে টঙ্গী শিল্পাঞ্চলে ২৬৭ জন কারখানা মালিক আওয়ামীপন্থি, বিএনপিপন্থি মাত্র পাঁচজন এবং অরাজনৈতিক ১১৫ জন। গাছা, বাসন, কোনাবাড়ি ও কাশিমপুর এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব শিল্পমালিক দলীয় কার্যক্রমে অর্থায়নের পাশাপাশি ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখছেন। সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপির কিছু নেতাকর্মী এসব ব্যবসা দখলের চেষ্টা করলেও আওয়ামীপন্থি মালিকদের প্রভাবের কারণে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে। বরং পরিকল্পিতভাবে সরকারবিরোধীদের বিরুদ্ধে দখলদার ও সন্ত্রাসী তকমা লাগানোর অভিযোগও উঠেছে।
কেকে/এলএ