বিদেশে পাড়ি জমিয়ে ভাগ্য বদলাতে চেয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার যুবক মো. রিয়াদ রশিদ (২৮)। স্বপ্ন ছিল রাশিয়ার ‘লাল পাসপোর্ট’ পেয়ে সেখানে স্থায়ী হওয়া ও পরিবারকে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু একটি ড্রোন হামলা কেড়ে নিল সব স্বপ্ন। রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কিছু দিনের মাথায় ইউক্রেন সীমান্তে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।
নিহত রিয়াদ রশিদ করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ ইউনিয়নের বাঁশহাটি গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রশিদের ছেলে। তার অকাল মৃত্যুর খবরে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
শনিবার (৯ মে) বিকালে রিয়াদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকাতুর পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়েছেন প্রতিবেশীরাও। উন্নত জীবনের আশায় বুক বেঁধে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে এখন দিশেহারা পরিবার।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ২ বছরের চুক্তিতে চায়না সিনোপিক নামক একটি কোম্পানির মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় যান রিয়াদ। সেখানে যাওয়ার পর তিনি রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে নিয়োগ পান। গত ২ মে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় রিয়াদসহ দুইজন বাংলাদেশি ও একজন নাইজেরিয়ান সৈন্য নিহত হন। এছাড়া আরও তিনজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
রিয়াদের পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ২ মের ওই হামলার পর থেকে রিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। গতকাল তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর ভেঙে পড়েছে পরিবারটি। উন্নত জীবনের আশায় বুক বেঁধে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে এখন তার মরদেহ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন তারা।
রিয়াদ রশিদের চাচাত ভাই জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘পাঁচ-ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ রিয়াদ রশিদ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটি কোম্পানির চাকরি করতে রাশিয়াতে যান। গত ৭ এপ্রিল রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে রিয়াদ রশিদসহ আরও অনেক বাংলাদেশি যোগদান করেন। রিয়াদ রশিদের ব্যাচ নম্বর হচ্ছে ৭৩৫। সেনাবাহিনী থেকে তাকে অফার করা হয় লাল পাসপোর্টে, এই কথাগুলো আমাকে বলেছিল রিয়াদ।’
নিহতের ছোট ভাই আলতাফ রশিদ জানান, বড় ভাই আমাকে আসস্ত করেন আমাদের সব ডকুমেন্টস সরকারের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। কয়েক মাস পরে আমাদের পরিবারের সবাইকে রাশিয়ায় নিতে পারবেন। এছাড়াও পেয়েছিল মোটা অঙ্কের টাকা। এই টাকা থেকে যার মাধ্যমে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর লিংক পেয়েছিল তাকে দেয় ১২ লাখ টাকা। এছাড়াও ৩০ লাখ টাকা ছিল তার হাতে, কিন্তু পাঠাতে পারেনি। রিয়াদ ভাইয়ের সাথে আমাদের শেষ কথা হয় গত ২৮ এপ্রিল। আর ম্যাসেঞ্জারে তাকে অনলাইনে দেখা গেছে ২৯ এপ্রিল রাত ১০টা পর্যন্ত। তার সহকর্মী লিমন দত্ত জানিয়েছে ড্রোন হামলায় রিয়াদের দেহ পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে।
নিহতের বড় ভাই মামুনুর রশীদ রবিন বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত কালকে আমি আমার ছোট ভাইয়ের বন্ধুদের অনেক অনুরোধ করি যে আসলে সমস্যাটা কী তা জানানোর জন্য। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তারা আমাকে জানায় যে, ‘ভাই, আপনার ভাই আর নেই। এই খবরটা কীভাবে দেব সেই ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলেই এতক্ষণ শুধু ভালো আছে বলে আপনাকে সান্ত্বনা দিয়েছি।’ তারা আরও বলে যে, ‘ভাই, আপনি আশা ছেড়ে দেন।’ আমি যখন জানতে চাইলাম তাকে ফিরিয়ে আনার কোনো সুযোগ আছে কি না, তখন তারা জানাল, ‘ভাই, এখানে যে একবার যায় তার ফিরে আসার কোনো পথ থাকে না। সেখানে শুধু ছাই অবশিষ্ট থাকে, আর ছাই তো আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব না।’ এই কথা হওয়ার পর তাদের সাথে আমার আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। আমার ভাইয়ের সাথে থাকা একজন ব্যক্তি জীবিত আছেন, তবে তিনি তার হাত হারিয়েছেন। তিনি শুধু এটুকুই বলেছেন— ‘ভাই, আমি যদি আগে জানতাম তবে না খেয়ে থাকতাম, তাও ওই জায়গায় যেতাম না।’ তার সাথে আমাদের শুধু এইটুকুই কথা হয়েছে। আমাদের বলা হয়েছে যে তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হলে যেন আমরা পুনরায় যোগাযোগ করি।’
নিহত রিয়াদ রশিদের বাবা এবং জাফরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আমার ছেলে যে সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে যাচ্ছে, সেই বিষয়টি আমাকে আগে জানায়নি। জানলে আমি তাকে কখনই সেখানে যেতে দিতাম না। গত ২৯ তারিখ মোবাইলে তার সাথে আমার শেষ কথা হয়। সে আমাকে বলেছিল, ‘আমি অন্য এক জায়গায় যাচ্ছি, সেখানে গিয়ে নেটওয়ার্ক পেলে আপনাদের কল দেব। যদি কল দিতে দেরি হয় তবে চিন্তা করবেন না, আমি ভালো আছি।’ এরপর থেকে তার সাথে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। আমি প্রতিদিন মোবাইল চেক করতাম সে অনলাইনে আসে কি না, কিন্তু তাকে আর পাওয়া যাচ্ছিল না। কোনো উপায় না পেয়ে গত ৮ তারিখ রিয়াদের এক বন্ধুর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করি। পরে সে জানায় যে, রিয়াদের সাথে থাকা এক হিন্দু ভদ্রলোক অনলাইনে থাকলেও কোনো মেসেজ বা ভয়েস কলের উত্তর দিচ্ছেন না। পরবর্তী রিয়াদের আগের কর্মস্থলের এক মুসলিম সহকর্মীর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে রিয়াদ আর নেই। সেই হিন্দু ভদ্রলোকও পরে রিয়াদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।’
ছেলের মরদেহ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান যে, সেখানে ছাই ছাড়া আর কিছু পাওয়ার নেই। আমার ছেলে যেহেতু নিয়ম অনুযায়ী সকল প্রটোকল মেনে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সেখানে গিয়েছিল, তাই এখন সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি—আমার ছেলের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ যেন আদায় করে দেওয়া হয়।
করিমগঞ্জের জাফরাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু সাদাৎ মো. সায়েম বলেন, ‘রিয়াদ রশিদ আমার স্নেহের ছোট ভাই। ঘটনাটি জানার পর তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতার সুযোগ থাকলে সে ব্যবস্থা করব ইনশাআল্লাহ।’
করিমগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. এমরানুল কবির বলেন, ‘পুলিশ নিহত রিয়াদ রশিদের বাড়িতে গিয়েছিল। পরিবারের সূত্রে মৃত্যুর বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।’
কেকে/এমএ