মাসিক বেতন থেকে দাবিকৃত চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় এক অস্থায়ী গেইটম্যানকে নিয়মবহির্ভূতভাবে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পিডব্লিউআই) জুলহাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী ওই গেইটম্যানের দাবি, পিডব্লিউআই জুলহাস উদ্দিন যোগদানের পর থেকেই তার কাছ থেকে মাসিক বেতনের একটি নির্দিষ্ট অংশ ‘কমিশন’ বা চাঁদা হিসেবে দাবি করে আসছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে এই অন্যায় আবদার মেনে নিতে না পেরে প্রতিবাদ করায় তাকে কর্মস্থল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী গেইটম্যান তৌফিকুর রহমান ও তার পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও এমন অভিযোগ করেছেন। এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় রেলওয়ে কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগী গেইটম্যানকে চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
অভিযোগ বলা হয়, রেলওয়ের অস্থায়ী গেইটম্যানদের মাসিক বেতন থেকে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট অংশ ‘চাঁদা’ হিসেবে আদায় করা হতো। নির্ধারিত টাকা না দিলে চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হতো। বেতন বৃদ্ধি হওয়ায় চাঁদার পরিমাণও বৃষ্টি করে দেয় কিশোরগঞ্জ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পিডব্লিউআই) জুলহাস উদ্দিন। এই অনৈতিক দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই তৌফিকুর রহমানকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে অস্থায়ী গেইটম্যান তৌফিকুর রহমানকে।
ভুক্তভোগী তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘কিছুদিন আগে পিডব্লিউআই স্যার আমাকে ঢাকায় ডেকে বলেন, আগে যখন বেতন ১৫ হাজার টাকা ছিল তখন চাঁদা দিতেন ২২৫০ টাকা। এখন আপনার বেতন বেড়ে ২০ হাজার ৩০০ টাকা হয়েছে। এখন মাসিক চাঁদা দিবেন ৪ হাজার টাকা। না দিলে যেকোনো সময় চাকরি চলে যাবে। গত ১০ এপ্রিল ‘উজ্জ্বল’ নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে আমার কাছে ২ লাখ টাকা দাবি করেন কিশোরগঞ্জ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পিডব্লিউআই) জুলহাস উদ্দিন।’
তৌফিকুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, আমাকে বলা হয়, ২ লাখ টাকা দিলে চাকরিতে রাখা হবে, না হলে বিনা নোটিশে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হবে। আমি সংসারের অবস্থার কথা বললেও তারা কোনো কথা শোনেনি। গত ১১ এপ্রিল ফোনে আমাকে চাকরি থেকে অব্যাহতির কথা জানানো হয়। এরপর প্রায় এক মাস বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান পায়নি। ২ লাখ টাকা না দিলে চাকরিতে বহাল রাখা সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আমরা রেললাইনের নিরাপত্তা দিই। সামান্য বেতন থেকেও ভাগ দিতে হয়। প্রতিবাদ করায় আজ পরিবার নিয়ে পথে বসার অবস্থা হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার ও চাকরি ফেরত চাই।
তৌফিকুর রহমানের স্ত্রী জেরিন চাঁদা দাবির বিভিন্ন মেসেজ ও ডিজিটাল তথ্য উপস্থাপন করে তিনি অভিযোগ করেন, কর্মকর্তা জুলহাস উদ্দিন সরাসরি টাকা না নিয়ে তার ঘনিষ্ঠ গেইটম্যান সাদিকুর রহমানের মাধ্যমে তিনি চাঁদা সংগ্রহ করতেন। সাদিকুর রহমান তার ছেলের নামে খোলা ‘খালিদ বিন ওয়ালিদ’ আইডি থেকে নিয়মিত মেসেজ পাঠিয়ে টাকা চাইতেন। মেসেজে লেখা থাকত, ‘পিডব্লিউ স্যারের বিষয়, সোমবার দিবেন ১২৫০ টাকা’। পাঁচ বছর ধরে আমার স্বামী দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় আজ চাকরি হারাতে হয়েছে।
স্থানীয় এলাকায় বাসিন্দা আবু সায়িদ বলেন, ‘আমাদের বাসার সামনেই রেলওয়ে অফিস হওয়ায় এখানকার অনিয়মগুলো আমরা নিয়মিত দেখছি। আমার দাদা-নানারা দীর্ঘ বছর রেলওয়েতে চাকরি করেছেন, তাই এই দপ্তরের কার্যক্রম সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে। এর আগে চাদাঁবাজি ও দুর্নীতির কারণে আমরা মানববন্ধনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী পিডব্লিউডি কর্মকর্তাকে এখান থেকে বিদায় করেছিলাম। আশা ছিল পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে, কিন্তু বর্তমান কর্মকর্তা জুলহাস আসার পরও সেই একই চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, আমাদের এলাকার একজন শ্রমিকের কাছ থেকে চাকরির বিনিময়ে দুই লক্ষ টাকা দাবি করা হয়েছে। সেই লোকটা দীর্ঘদিন ধরে তার পেছনে ঘুরলেও তাকে চাকরি দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি, কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তিন লক্ষ টাকার বিনিময়ে অন্য একজনকে সেই চাকরি দেওয়া হয়েছে, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা বড়জোর অষ্টম বা দশম শ্রেণি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জুলহাস সাহেব গত ৩-৪ মাস ধরে কিশোরগঞ্জে তার কর্মস্থলে আসেন না। তার অফিস এখানে হওয়া সত্ত্বেও তিনি দিনের পর দিন নরসিংদীতে অবস্থান করছেন। আমরা কথা বলার জন্য কয়েকবার তার অফিসে গিয়েও তাকে পাইনি। আমরা চাই এই চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি চিরতরে বন্ধ হোক এবং যোগ্য ব্যক্তি যেন তার প্রাপ্য চাকরিটি ফিরে পান।
টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গেইটম্যান সাদেকুর বলেন, টাকা নেওয়ার অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। মেসেঞ্জারে টাকা চাওয়ার যে বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে, সেটি তার সাবেক স্ত্রী ও তৌফিকুর রহমান মিলে তৈরি করেছেন। তিনি দাবি করেন, ‘খালিদ বিন ওয়ালিদ’ নামের ফেসবুক আইডিটি তার সাবেক স্ত্রী পরিচালনা করতেন। তৌফিকুর রহমানের সঙ্গে তার সাবেক স্ত্রীর পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে ওঠায় তিনি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন বলেও জানান। এছাড়া, তার ও সংশ্লিষ্ট স্যারের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে দাবি করেন সাদেকুর।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পিডব্লিউআই) জুলহাস উদ্দিনের সাথে ফোনে কথা হলে তিনি খোলা কাগজকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। আমি যদি সত্যিই চাঁদাবাজি করতাম, তবে কেবল একজনের কাছে কেন করব? আর আমি কিশোরগঞ্জে চাকরি করতে এসেছি, একজন স্থানীয় ছেলের সাথে ঝামেলা বা তার কাছে চাঁদা চাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তাকে কাজ থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।’
তিনি বলেন, ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার এবং চিফ ইঞ্জিনিয়ার স্যারের নির্দেশেই তার দায়িত্ব অবহেলা এবং অসংলগ্ন আচরণের কারণে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এখন চাকরি হারিয়ে ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা থেকে সে আমার বিরুদ্ধে এই ধরনের মিথ্যা অপবাদ ছড়াচ্ছে। আপনারা চাইলে এর সত্যতা যাচাই করতে পারেন। গত ছয় মাসে কাজের প্রয়োজনে বা অন্য কোনো কারণেও তার সাথে আমার কোনো কথা হয়নি। যেখানে কথা-বার্তাই হয়নি, সেখানে চাঁদা চাওয়ার বিষয়টি একেবারেই অসম্ভব ও কাল্পনিক।
অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আহসান হাবিবের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোনে সাড়া দেননি।
কেকে/ এমএস