ভারত ইউনিয়নে বাংলার জনমানসে এবং রাজনীতির প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একজন কবি নন; তিনি এক অপরিহার্য আদর্শিক মেরু। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ময়দানে যে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই রবীন্দ্রনাথকে এড়িয়ে চলা অসম্ভব। বিশেষ করে গত এক দশকে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যখন বাংলা জয়ের লক্ষ্যে তাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অভিযান তীব্র করেছে, তখন রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন তাদের অন্যতম প্রধান উপজীব্য।
একদিকে মোদি-শাহের ভাষণে রবীন্দ্র-উদ্ধৃতি, প্রধানমন্ত্রীর রবীন্দ্র-সদৃশ লুক, শান্তিনিকেতনে কেন্দ্রীয় নেতাদের আনাগোনা আর অন্যদিকে রবীন্দ্র-দর্শন ও হিন্দুত্ববাদী আদর্শের অন্তর্নিহিত সংঘাত। এ দুইয়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ এক বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে : বিজেপি কি প্রকৃতই রবীন্দ্র-আদর্শকে ধারণ করতে চাইছে, নাকি এটি কেবলই বাংলার মানুষের মন জয়ের এক রাজনৈতিক কৌশল?
বিজেপি ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের আলোচনায় সবচেয়ে বড় বিতর্কটি তৈরি হয় ‘জাতীয়তাবাদ’ বা ‘ন্যাশনালিজম’ নিয়ে। বিজেপির মূল ভিত্তি হলো ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ বা হিন্দুত্ববাদ। তাদের কাছে রাষ্ট্র হলো একটি অখণ্ড একক, যার ভিত্তি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ন্যাশনালিজম’ নামক প্রবন্ধ সংকলনে উগ্র জাতীয়তাবাদের ঘোর বিরোধিতা করেছেন।
তিনি লিখেছিলেন : ‘দেশপ্রেমই আমাদের শেষ আধ্যাত্মিক আশ্রয় হতে পারে না; আমার আশ্রয় হলো মানবতা। আমি হিরে কেনার দামে কাঁচ কিনব না, এবং যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ দেশপ্রেমকে মানবতার ওপর জয়ী হতে দেব না।’ রবীন্দ্রনাথের কাছে দেশ ছিল একটি ভৌগোলিক সীমানার চেয়েও বড় মানবিক সত্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাতীয়তাবাদ মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে এবং যুদ্ধের জন্ম দেয়। বিশেষ করে ইউরোপীয় ধাঁচের যে ‘নেশন-স্টেট’ ধারণা, তাকে তিনি ‘যান্ত্রিক’ এবং ‘প্রাণহীন’ বলে অভিহিত করেছেন। বিপরীতে, বিজেপি যে ‘ভারত মাতা’ বা উগ্র রাষ্ট্রবাদের ধারণা প্রচার করে, তার সঙ্গে রবীন্দ্র-ভাবনার দূরত্ব দুস্তর।
বিজেপির স্লোগান ‘এক দেশ, এক বিধান, এক নিশান’। তারা একটি ‘ইউনিফর্ম’ জাতীয় পরিচয়ের পক্ষপাতী। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষ ছিল মহামিলনের তীর্থভূমি। ‘ভারততীর্থ’ কবিতায় তিনি উদাত্ত কণ্ঠে গেয়েছেন : ‘এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু-মুসলমান।/ এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ, এসো এসো খৃষ্টান।/ এসো ব্রাহ্মণ, শুচি করি মন ধরো হাত সবাকার,/ এসো হে পতীত, হোক অপনীত সব অপমানভার।’
রবীন্দ্রনাথের এই ‘ভারত’ কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা গোষ্ঠীর নয়। এটি শক, হুন, পাঠান, মোগল সবার সংমিশ্রণে তৈরি এক বহুমাত্রিক সত্তা। বিজেপি যখন নাগরিকত্ব আইন বা এনআরসি নিয়ে সরব হয়, তখন সমালোচকরা রবীন্দ্র-সাহিত্যের এই বহুত্বের আদর্শকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। বিজেপির কাছে ভারতীয়ত্ব মানে যেখানে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠত্ব, রবীন্দ্রনাথের কাছে সেখানে ভারতীয়ত্ব হলো ‘মানুষের সত্যকে স্বীকার করা’।
রবীন্দ্রনাথের ধর্মতত্ত্ব অত্যন্ত গভীর ও ব্যক্তিগত। তার কাছে ধর্ম মানে ‘মানুষের ধর্ম’। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বা আচারসর্বস্বতার বিরোধী ছিলেন। ‘অচলায়তন’ নাটকে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে মুক্ত আকাশ ও মুক্ত চিন্তা বেশি জরুরি। বিজেপি যখন রামমন্দির বা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে, তখন রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতার গ্রাস’ বা ‘বিসর্জন’ নাটকের কথা মনে পড়ে। ‘বিসর্জন’ নাটকে তিনি জয়সিংহের মাধ্যমে ধর্মের নামে হিংসাকে তীব্র আঘাত করেছিলেন :
‘পাষাণ কি কথা কয়? পাষাণ যদি কথা কহিত, তবে সে কি এই রক্ত মাখিয়া নীরব হইয়া থাকিত?’
রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর মন্দিরের ভেতরে বন্দি নন, তিনি আছেন ‘যেথা চাষা চাষ করিছে কঠিন মাটি চিরে,/ যেথা পাথর কাটিছে পথ খানি।’ অন্যদিকে, বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনৈতিক সংস্করণ অনেক সময় রবীন্দ্র-ভাবনার এই মরমী ও উদার আধ্যাত্মিকতার চেয়ে বেশি রণকামী।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজেপি ও রবীন্দ্রনাথের সংঘাতের সবচেয়ে দৃশ্যমান মঞ্চ হলো বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার সুবাদে এখানকার আচার্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সঙ্গে আশ্রমিকদের দূরত্ব বেড়েছে। শান্তিনিকেতনের ‘পৌষমেলা’ বন্ধ হওয়া বা প্রাচীর তোলা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আসলে রবীন্দ্র-আদর্শের সঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ক্ষমতার লড়াই।
রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতন হবে ‘মুক্তির নিকেতন’। তিনি চেয়েছিলেন ‘যেখানে নেইকো মানা, যেখানে নেইকো কোনো বেড়া’। কিন্তু বর্তমান শাসনব্যবস্থায় যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কড়া নজরদারি বা ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করা হয়, তখন তা সরাসরি রবীন্দ্র-দর্শনকে উপহাস করার শামিল হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে ঘটনাপ্রবাহ আমরা দেখেছি, তা গেরুয়া রাজনীতির রবীন্দ্র-প্রীতির আসল রূপটি চোখে দাগ দিয়ে দেখিয়ে দেয় রোদচশমার কাঁচটি কতখানি অস্বচ্ছ।
ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, বর্তমান শাসক দল বিজেপি রবীন্দ্রনাথের কেবল সেই অংশটুকুই গ্রহণ করতে চায় যা তাদের ‘ভারত গৌরব’ বা ‘প্রাচীন ঐতিহ্যে’র প্রচারণায় সুবিধা দেয়। কিন্তু যে রবীন্দ্রনাথ ‘অচলায়তন’ নাটকের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় গোঁড়ামিকে কুঠারাঘাত করেছিলেন, সেই রবীন্দ্রনাথকে তারা আলমারিতে বন্দি করে রাখতে চায়। এতসব আদর্শিক বৈপরীত্য সত্ত্বেও বিজেপি কেন বারবার রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বাংলার ‘সাংস্কৃতিক মূলধনে’। বাংলায় ভোট পেতে গেলে কেবল উন্নয়ন দিয়ে হয় না, মানুষের আবেগকে স্পর্শ করতে হয়। আর বাঙালির আবেগ মানেই রবীন্দ্রনাথ।
নরেন্দ্র মোদি যখন ‘একলা চলো রে’ গানের উদ্ধৃতি দেন বা রবীন্দ্রনাথের মতো দীর্ঘ শ্মশ্রু রাখেন, তখন তিনি আসলে বাঙালির ঘরের লোক হয়ে ওঠার চেষ্টা করেন। জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাথে রবীন্দ্রনাথের সুসম্পর্কের কথা প্রচার করে বিজেপি এটি বোঝাতে চায় যে, তাদের শিকড়ও বাংলার মাটির সাথে যুক্ত। কিন্তু বিজেপি রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করতে চায় তার ‘উগ্র জাতীয়তাবাদী’ ব্যাখ্যা দিয়ে, যা আসলে মূল রবীন্দ্র-দর্শনের অপব্যাখ্যা মাত্র।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : ‘বাইরের সাদৃশ্য যখন ভেতরের বৈষম্যকে ঢাকতে চায়, তখন তা ভণ্ডামিতে পর্যবসিত হয়।’ সুগত বসু তার ‘দ্যা ন্যাশষন অ্যাস মাদার’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, রবীন্দ্রনাথের কাছে ভারতবর্ষ কোনো ম্যাপ বা ভূখণ্ড ছিল না, বরং তা ছিল একটি ‘অ্যাসথেটিক ভিশন’ বা নান্দনিক চেতনা। বর্তমান রাজনীতির ‘পলিটিক্যাল ম্যাপিং’ সেই চেতনার সূক্ষ্মতাকে বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে। সুগত বসু দেখিয়েছেন যে, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন ‘ভারতমাতা’র ছবি এঁকেছিলেন (১৯০৫), তিনি তাকে কোনো রণংদেহী দেবী হিসেবে নয়, বরং একজন সাধারণ শাশ্বত বাঙালি নারী বা ‘অন্নপূর্ণা’ হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এই ছবির প্রশংসা করেছিলেন কারণ এটি ছিল ‘মমতাময়ী’ এবং ‘অসাম্প্রদায়িক’।
সুগত বসু যুক্তি দেন যে, বর্তমান গেরুয়া রাজনীতি এই মাতৃমূর্তিকে একটি ‘যোদ্ধা দেবী’ বা নির্দিষ্ট ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে বন্দি করতে চায়, যা রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের সেই মূল ‘মমতাময়ী’ ও ‘সকলের জন্য উন্মুক্ত’ ভারতমাতা ধারণার পরিপন্থি। ‘ঘধঃরড়হ-এর যে রাক্ষসী মূর্তি আজ জগৎ জুড়ে মানুষের রক্ত পান করে বেড়াচ্ছে, তার আরাধনা আমি কোনোদিনই করব না।’ (রবীন্দ্রনাথের চিঠি থেকে ভাবানুবাদ)। রবীন্দ্রনাথ কোনো দলের সম্পত্তি নন। তিনি একটি প্রবাহিত নদী, যে নদী থেকে সবাই আপন কলস ভরে নিতে চায়। বিজেপিও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে বিজেপির রবীন্দ্র-চর্চা ততক্ষণ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ এবং প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে, যতক্ষণ না তারা রবীন্দ্র-সাহিত্যের মূল সুর অর্থাৎ উদারতা, বহুত্ববাদ এবং মানবতার জয়গানকে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে স্থান দিতে পারবে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, / জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর / আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী / বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি।’
আজকের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের এই ‘খণ্ড ক্ষুদ্র করি’ না রাখার আহ্বানই সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। বিজেপি যদি সত্যি রবীন্দ্র-ভক্ত হতে চায়, তবে তাদের কেবল উদ্ধৃতি নয়, সেই ‘মুক্ত শির’ ও ‘মুক্ত জ্ঞান’-এর পথকেই আপন করে নিতে হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ের অসহিষ্ণুতা ও মেরুকরণের রাজনীতি কি সেই রবীন্দ্র-আলোকে পথ চলতে প্রস্তুত? ইতিহাস এই প্রশ্নের উত্তর দেবে। আপাতত, রবীন্দ্রনাথ তার গানের মতোই সত্য হয়ে বিরাজ করবেন সব রাজনীতির ঊর্ধ্বে, সব সংকীর্ণতার ওপারে। রাজনীতির রোদচশমা খুলে না ফেললে রবির প্রকৃত তেজ অনুভব করা অসম্ভব।
লেখক : চলচ্চিত্রকার, নৃবিজ্ঞানী
কেকে/ এমএস