দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে একের পর এক ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ক্যাম্পাসগুলো। রাজধানীর তিতুমীর কলেজের পর এবার ইডেন কলেজে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’র ব্যানারে গভীর রাতে বিক্ষোভ ও গেট ভাঙার ঘটনা নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের এমন দাবির নেপথ্যে ছাত্রশিবিরের ইন্ধন রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, ক্যাম্পাসে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ ধরে রাখতে ছাত্রশিবির দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কৌশলে এ অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’— এমন ন্যারেটিভ।
কিন্তু সংগঠনটির এমন পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তা ভেস্তে গেছে। যার ফলে এবার তুরুপের তাস হিসেবে ছাত্রীসংস্থার সদস্যদের ব্যবহার করে সংগঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এ ছাত্র সংগঠনটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হল দখল, চাঁদাবাজি, সিট বাণিজ্য ও সহিংসতার অভিযোগে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। সেই ক্ষোভকে পুঁজি করেই একটি গোষ্ঠী ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’ স্লোগানকে সামনে এনে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ নিচ্ছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির অভিযোগ করেছেন, ‘ছাত্রীসংস্থার গুপ্ত কর্মীদের ইন্ধনে’ ইডেন কলেজে ‘মব’ সৃষ্টি করা হয়েছে। তার দাবি, সাধারণ শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে সংগঠিত একটি গোষ্ঠী বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
তিনি তিতুমীর কলেজের ঘটনা টেনে বলেন, কিছুদিন আগে সেখানে রাতের বেলা গেট ভেঙে মব সৃষ্টি করা হয় এবং ছাত্রদলের নেত্রীদের হেনস্তা করা হয়। ওই ঘটনায় জড়িত এক ব্যক্তি পরে কলেজ শাখা শিবিরের সেক্রেটারি হিসেবে পরিচিত হন।
গতকাল রোববার দিবাগত রাত ১টা ১৫ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি। একইসঙ্গে কলেজ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সব শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের ‘কূটচাল বা ধোঁকাবাজির’ কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বানও জানান তিনি।
ছাত্রদল সেক্রেটারির বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ফেসবুকে কয়েকটি ‘পত্রিকার কাটিং’ জুড়ে দিয়ে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ লিখেছেন, ‘ছাত্রদলের পুরোনো এ আমলনামা ইডেনের শিক্ষার্থীদের কাছে নিশ্চয়ই জানা আছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ছাত্রদল নিজেদের সংশোধন না করে বরং ঠিক তাদের পুরোনো পন্থায় রাজনীতি করে আবারও দেশের নানা জায়গায় সাংগঠনিক স্ট্রাকচার তৈরি করে চাঁদাবাজি করেছে, খুন-ধর্ষণসহ সব ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পুরো ছাত্র রাজনীতিকে কলুষিত করেছে। ফলে ভীতসন্ত্রস্ত শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে রাজনীতির বিরুদ্ধে স্লোগান তুলছে। ছাত্রদলের প্রতি অনুরোধ, শিক্ষার্থীদের দাস বানানোর প্রকল্প থেকে সরে আসুন। দলকে নতুন করে সাজান, সাংগঠনিক কর্মসূচিগুলো শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নতুনরূপে সাজান। সময় পেরিয়ে গেলে আর সুযোগ পাবেন না।’
ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতা মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন। গতকাল রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনে এক পোস্টে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী সেজে সুবিধা নিতে শিবির আবারও গুপ্ত হতে চাচ্ছে’ মন্তব্য করে রাশেদ খাঁন বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ছাত্র রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। জোরপূর্বক মিছিল-মিটিংয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাওয়া, গণরুম-গেস্টরুমের নির্যাতন— কোনোটাই নেই। কিন্তু শিবির গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সময়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ চেয়েছিল। কারণ তারা ভেবেছিল যে, হয়তো তারা আওয়ামী লীগের পতনের পরও ওইভাবে প্রকাশ্যে রাজনীতির সুযোগ পাবে না।
তিনি আরও বলেন, ‘শিয়ালের লেজকাটা গল্পের মতো আরকি! কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তারা একের পর এক আত্মপ্রকাশ করেছে। সবাই তাদের সাধুবাদ জানিয়েছে। শিবিরের যারা প্রকাশ্যে এসেছে, আজ অবধি কারও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু গুপ্ত হয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী সেজে থাকার মধ্যে অনেক সুবিধা আছে। যেটা তারা গুপ্ত থাকার আগে ও সুপ্ত হওয়ার পরের সময়ের মধ্যে অ্যানালাইসিস করে পেয়েছে। এ কারণে শিবির আবারও গুপ্ত হতে চাচ্ছে।’
রাশেদ খাঁন বলেন, ‘ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের নামে গত রাতে ইডেন কলেজ উত্তাল হয়েছে। অবাক হয়ে গেলাম, এসব শিক্ষার্থী অধিকাংশই নেকাব কিংবা মাস্ক পরা! অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ইডেনের যেসব শিক্ষার্থী গেট ভেঙে নেমে এসেছিল, তারা কিন্তু খুব স্বাভাবিক পোশাকেই বের হয়ে এসেছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা নেকাব বা মাস্ক পরে নিজেকে লুকাতে চায়নি! আমি আমার এই বোনদের পরামর্শ দেব, প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে ইডেনের সামনে রাস্তার দুই ধার দিয়ে যেসব কাপল বসে থাকে... কারা বসে থাকে জানি না, কিন্তু এটা বন্ধ করতে পারলে আপনাদের সুনাম হবে। এটা বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করলে মানুষ সাধুবাদ জানাবে।’
রাশেদ খাঁন বলেন, ‘কোনো অভিভাবক কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে সেটা হল কিংবা ক্যাম্পাসের গেস্টরুমে সাক্ষাতের সুযোগ আছে। কিন্তু রাস্তার দুই ধারে দীর্ঘসময় বসে থেকে যারা ইডেনের বদনাম করছে, এই অপসংস্কৃতি বন্ধে আপনাদের কঠোর আন্দোলন দেখতে চাই। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ নয়, অপসংস্কৃতি নিষিদ্ধ হোক।’
অন্যদিকে ছাত্রদলের এমন মন্তব্য প্রসঙ্গে ছাত্রশিবিরের ভাষ্য, ছাত্রদল ‘পুরোনো পন্থায়’ ছাত্র রাজনীতিকে ‘কলুষিত’ করেছে। ফলে ‘ভীতসন্ত্রস্ত’ শিক্ষার্থীরা রাজনীতির বিরুদ্ধে স্লোগান তুলছে।
প্রসঙ্গত, ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে গত শনিবার রাতে ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় মূল ফটকের তালা ভেঙে কলেজ ছাত্রদলের একজন পদপ্রত্যাশীর টানানো ব্যানার ছিঁড়ে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। রাত ১১টার দিকে কলেজের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে বাইরে বের হয়ে আসেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাদের ‘ছাত্র রাজনীতির ঠিকানা, এই ইডেনে হবে না’— এমন স্লোগান দিতে শোনা যায়।
এর আগে সন্ধ্যার দিকে ইডেন কলেজের ফটকে লেখা ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’ কথাটি রং দিয়ে মুছে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার জেরেই একদল শিক্ষার্থী বিক্ষোভ শুরু করেন।
জানা গেছে, রাত ১১টার দিকে হজরত রাবেয়া বসরী ছাত্রীনিবাসের শিক্ষার্থীসহ কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। শুরুতে তারা মূল ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে নানা স্লোগান দেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা ক্যাম্পাসের কয়েকটি ফটকের তালা ভাঙার চেষ্টা করেন এবং মূল ফটকের তালা ভাঙতে সক্ষম হন।
এরপর কলেজ থেকে বের হয়ে পাশে টানানো একটি ব্যানারে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেন। ব্যানারটিতে দেখা যায়, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত কয়েকটি আসনের সংসদ সদস্যদের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি প্রার্থী তৈয়বা ত্বাহা। এ ব্যানারটিতেই আগুন লাগানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন একদল শিক্ষার্থী। পরে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা কলেজের মূল ফটকে কালো রঙে ‘সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত ইডেন ক্যাম্পাস’ কথাটি লিখে দেন।
কেকে/এলএ