বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নের ক্ষমতা এখন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের হাতে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে মহাপরিচালকের (ডিজি) ক্ষমতা খর্ব হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি।
সূত্র বলছে, মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত ভূ-সম্পত্তি বিভাগের ফিল্ড কানুনগোসহ অন্তত ১৮ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। এসব বদলিকে ঘিরে অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বদলি প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখার একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তদবির চালানো হয়।
কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন একই দপ্তরে থাকা কর্মকর্তাদের বদলি না করে অন্যদের সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কিছু কর্মকর্তার বদলি স্থগিত থাকলেও নতুন পদোন্নতিপ্রাপ্তদের দায়িত্ব পালনের অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষও তৈরি হয়েছে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, ভূ-সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের পছন্দের জায়গায় যেতে যোগাযোগ করা হয় মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব রূপম আনোয়ারের সঙ্গে। যাদের সরাসরি যোগাযোগ করার সুযোগ নেই, তারা রাজশাহী সদর প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা নাদিম সারোয়ারের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। রাজশাহী ভূমি অফিসের অফিস সহকারী রফিকুল ইসলামের বদলি ঠেকাতে নাদিম সারোয়ারের মাধ্যমে তদবির করা হয় বলে সূত্রে জানা গেছে।
রফিকুল রাজশাহী সিইও দপ্তরে ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে একই দপ্তরে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
ঢাকা কমলাপুর ভূমি অফিসের রফিকুল ইসলাম ১২ বছর ধরে কর্মরত রয়েছেন। তার বদলি ঠেকাতে তিনি নিজেই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়। তাদের তদবিরের বলির পাঁঠা হয়েছেন আট মাস আগে পদোন্নতি পাওয়া অফিস সহকারী আনোয়ার হোসেন। দুই রফিকুলকে বাদ দিয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার দপ্তর থেকে আনোয়ারকে চট্টগ্রাম ভূমি অফিসে বদলি করা হয়।
আনোয়ার বলেন, “আমার বদলির তালিকায় নাম ছিল না। রফিকুল তদবির করায় তার বদলি স্থগিত করে আমাকে রাজশাহী থেকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়।”
এদিকে অফিস সহকারী অলিভের বিরুদ্ধে পাহাড়সম ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অদৃশ্য ক্ষমতায় মন্ত্রণালয় তাকে ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) পাকশি থেকে বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার দপ্তর, পাকশিতে বদলি করে।
ফিল্ড কানুনগো শরিফুলের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-নীতিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। পার্বতীপুর কাঁচারিতে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছিল। তাকে পাকশি থেকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয় ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর। রেল কর্তৃপক্ষের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি কয়েক মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। অবশেষে চলতি বছরের ২১ মার্চ চট্টগ্রাম বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা দপ্তরে যোগদান করেন।
রেল সচিব ফাহিমুল ইসলামের কাছে শরিফুলের করা বদলি আবেদন আমলে নিয়ে তাকে আবারও পাকশিতে বদলি করার পাঁয়তারা করছে মন্ত্রণালয়। বদলি হওয়ার আগেই গত ৬ মে দ্বিপ্রহরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পাকশির ডিইওকে ফোন করে নির্দেশনা দেওয়া হয়, শরিফুল খুলনা, ঈশ্বরদী ও রাজশাহী ছাড়া যে কোনো কাঁচারিতে দায়িত্ব পালন করবেন।
সূত্র বলছে, শরিফুলের বদলির আবেদনটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
অপরদিকে পাকশি জলাশয় টেন্ডার নিয়ে ভূমি অফিসের উচ্চমান সহকারী তাপসী সুলতানার বিরুদ্ধে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সর্বোচ্চ দরদাতার তথ্য গোপন করে সর্বনিম্ন দরদাতাকে টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফিল্ড কানুনগো এবং অফিস সহকারীদের বদলি করা হলেও অদৃশ্য কারণে চার বিভাগের আমিনরা বদলি আদেশের বাইরে রয়েছেন কেন— তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাহলে কি তারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন?
তারা অভিযোগ তুলে বলেন, এ পর্যন্ত চার বিভাগের কোনো আমিনকে বদলি করা হয়নি। তারা একই বিভাগে ১০ থেকে ১২ বছর ধরে কর্মরত রয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, সচিব এবং অতিরিক্ত সচিব রূপম আনোয়ারের আতঙ্কে রয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। তারা দুজনই দেশজুড়ে আলোচিত সাবেক উপদেষ্টা ফায়জুল কবিরের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত।
বদলিপ্রাপ্ত কানুনগোদের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, উৎকোচের পরিমাণ বেশি দিলে পছন্দের জায়গায় বদলি হওয়া যায়। এমন গুঞ্জন ঘুরপাক খাচ্ছে মন্ত্রণালয়ের লোকমুখে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এর আগে কোনো সচিব বদলির দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। রেলের ইতিহাসে এই প্রথম রেলপথ মন্ত্রণালয় বদলির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বদলির তালিকা তৈরি করেন মন্ত্রণালয়ের ভূমি শাখার সহকারী সচিব মো. মাসুদ আলম।
এদিকে কানুনগো পদে পদোন্নতির তথ্য গোপন করে সংস্থাপন শাখা ই-৩ প্রতিবেদন দেওয়ায় গত ১২ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মাসুদ আলমের স্বাক্ষর করা জবাব চাওয়া ফাইলও সচিবের টেবিলে আটকে আছে। তথ্যটি নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক বিভাগ।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, মন্ত্রণালয়ের সংস্থাপন শাখা থেকে বদলি আদেশ না করে কেন ডিজির অধীনে সংস্থাপন ই-৩ শাখা থেকে বদলির আদেশ করানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম বলেন, “অভিযোগ এবং তথ্যপত্রের ভিত্তিতে যদি মনে করেন রিপোর্ট করার মতো বিষয়, নিশ্চয়ই রিপোর্ট করবেন। তথ্য-প্রমাণ থাকলে সংবাদকর্মীরা রিপোর্ট করবেন, এটাই স্বাভাবিক। তবে মন্ত্রণালয় চাইলে অনেক ক্ষেত্রে নানা পদে পদায়নে সচিব আদেশ দিতে পারেন।”
এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, “সচিব স্যারের বক্তব্যের পর আমার আর কিছু বলার থাকে না। এ কারণে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” তিনি এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কেকে/এলএ