ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির মূল এজেন্ডাই ছিল বাংলাদেশ ও মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণা। বিশেষ করে কথিত অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেয় দলটির নীতিনির্ধারকরা। নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বেড়া নির্মাণের জন্য ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফকে প্রয়োজনীয় জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি সীমান্ত রয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই স্থলসীমান্ত। এর মধ্যে শুধু পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে রয়েছে ২ হাজার ২১৭ কিলোমিটার। বাকি সীমান্ত আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্যের সঙ্গে। এর মধ্যে ৩ হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত সরকার। অবশিষ্ট সীমান্তেও বেড়া দেওয়ার চেষ্টায় আছে তারা। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনপরিপন্থি ও বাংলাদেশের আপত্তির কারণে অনেক জায়গায়ই পিছিয়ে গেছে বিএসএফ।
এবার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার আসায় এ কাজে নতুন গতি পাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বিজেপির একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য রয়েছে। তা হলো, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর নাম করে দেশটির মুসলিম নাগরিকদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের মুসলিম নাগরিকদের টার্গেট করেছে বিএসএফ। ইতোমধ্যে গত দেড় বছরে কয়েক হাজার বাংলাভাষী মুসলিম নাগরিককে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দিয়েছে বিএসএফ।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের কোনো প্রতিবাদে কর্ণপাত করেনি ভারত সরকার। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে কিছুটা পিছিয়ে আসে বিএসএফ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সেই উদ্যোগের পালে ফের হাওয়া লেগেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পুশইনের পর নাগরিকরা যাতে ভারতে ফিরতে না পারে, সেজন্য কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে নিজেদের সীমান্ত অভেদ্য করতে চাইছে ভারত। আর বাংলাদেশের শঙ্কা এখানেই। এ ছাড়া কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডও দখলে নিতে চায় ভারত। তারই অংশ হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাঁটাতার দেওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে ঢাকা বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতারে ভয় পায় না।
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার বসানোর জন্য পদক্ষেপ নিয়েছেন শুভেন্দু। এ জন্য প্রয়োজনীয় জমি ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের হাতে তুলে দেবে তার সরকার। গতকাল সোমবার নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, সীমান্তে কাঁটাতার বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় জমি ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের হাতে তুলে দেবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “প্রথম দিনই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর এবং বিএসএফকে আমরা জমি হস্তান্তরে অনুমোদন দিলাম। এ বিষয়ে ভূমি ও রাজস্ব সচিব এবং মুখ্য সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের হাতে প্রয়োজনীয় জমি তুলে দেওয়া হবে।”
এর আগে একাধিকবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সীমান্তে বিএসএফকে জমি না দেওয়ায় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এবার পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর এ বিষয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
গত শনিবার শপথ গ্রহণের পর পশ্চিমবঙ্গকে নতুন করে নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন শুভেন্দু অধিকারী।
বাংলাদেশের সঙ্গে এখনো অরক্ষিত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের ইস্যুটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বেশ আলোচিত ও বিতর্কিত একটি বিষয় হয়ে এত দিন ঝুলে ছিল। এবারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারেও বিজেপি ইস্যুটি নিয়ে সরব ছিল।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে কলকাতা হাইকোর্ট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্য সরকারকে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য নয়টি জেলায় বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ জন্য ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন আদালত।
কেকে/এলএ