মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
দেশজুড়ে
স্পেন থেকে ভালুকায় মানুষের সেবায় বেঞ্জামিনের তিন দশক
ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ১২:২৭ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

মানুষের সেবাই পরম ধর্ম—এই বিশ্বাসকে ধারণ করে সুদূর স্পেন থেকে বাংলাদেশে এসে প্রায় তিন দশক ধরে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ধর্মযাজক ফাদার বেঞ্জামিন গোমেজ। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার প্রত্যন্ত নলুয়াকুড়ি গ্রামে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসনের সুযোগ সৃষ্টি করে বদলে দিয়েছেন হাজারো মানুষের জীবন। ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে তার নিরলস কর্মযজ্ঞ এখন স্থানীয়দের কাছে মানবসেবার উজ্জ্বল প্রতীক।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের সবুজে ঘেরা নলুয়াকুড়ি গ্রাম। ১৯৯১ সালে যখন এলাকাটি ছিল নদীবেষ্টিত ও অবহেলিত, তখন জাভেরিয়ান মিশনারি সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে আসেন স্পেনের নাগরিক ফাদার বেঞ্জামিন গোমেজ। তার সঙ্গে ছিলেন ইতালীয় ধর্মযাজক ফাদার তনিনো ডিসেমব্রিনো। দুর্গম এই জনপদের মানুষের জীবনযাত্রার কষ্ট দেখে উন্নয়নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তারা নিজেদের উদ্যোগে লাউতি নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করেন। এতে বিচ্ছিন্ন গ্রামটির সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ সহজ হয়।

১৯৯৬ সালে সহযোদ্ধা ফাদার তনিনোর মৃত্যু হলেও থেমে যাননি ফাদার বেঞ্জামিন। গত তিন দশকে কারিতাস বাংলাদেশের সহযোগিতায় প্রায় ২০ একর জমির ওপর গড়ে তুলেছেন এক মানবিক কর্মযজ্ঞ। সেখানে আশ্রয় পেয়েছে শতাধিক ভূমিহীন পরিবার।

শুধু আবাসন নয়, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন নলুয়াকুড়ি কুমারী মারিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এবং কারিগরি শিক্ষার জন্য নলুয়াকুড়ি টেকনিক্যাল স্কুল। বর্তমানে দুটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি অসুস্থ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়াত সহযোদ্ধার স্মরণে গড়ে তুলেছেন ২৫ শয্যার ফাদার তনিনো মেমোরিয়াল হাসপাতাল। পথশিশু ও অসহায় কিশোর-কিশোরীদের জন্য নির্মাণ করেছেন পৃথক আবাসিক হোস্টেলও।

সাক্ষাৎকারে ফাদার বেঞ্জামিন গোমেজ বলেন, ‘গত ৩০ বছর ধরে আমি ভালুকা উপজেলার আওলাতলী গ্রামে বসবাস করছি। এখানকার মানুষ, পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে আমি গভীরভাবে মিশে গেছি। অবসর গ্রহণের পর জীবনের বাকি সময়টুকুও এখানেই কাটিয়ে দিতে চাই। সরকার যদি আমাকে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ দেয়, তবে বাংলাদেশেই স্থায়ীভাবে থেকে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই।’

স্থানীয় বাসিন্দা জোসেফ বাবু বলেন, ‘ফাদার বেঞ্জামিন শুধু একজন ধর্মযাজক নন, তিনি মানবতার সেবায় নিবেদিত এক আলোকবর্তিকা। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে ভালুকার মানুষের ভালোবাসার মধ্যেই থাকতে চান।’

আবাসন প্রকল্পের সুবিধাভোগী বার্নাড সাংমার স্ত্রী বলেন, ‘ফাদার আমাদের বিনামূল্যে ঘর করে দিয়েছেন। এখানে শতাধিক পরিবার তার সহায়তায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে। আমার তিন মেয়ের পড়াশোনার সব খরচও তিনি বহন করছেন।’

চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হওয়া এক নারী বলেন, ‘পা ভেঙে যাওয়ার পর আমার দুইবার অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। পুরো চিকিৎসা ব্যয়ও ফাদার দিয়েছেন। আমরা সনাতন ধর্ম পালন করি, কিন্তু কখনো ধর্ম পরিবর্তনের কথা বলেননি। ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রেখেই তিনি সবাইকে সহযোগিতা করেন।’

নলুয়াকুড়ি কুমারী মারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মারিয়া বলেন, ‘এই স্কুলে শুধু ভালো পড়াশোনাই নয়, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চারও সুযোগ রয়েছে। এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য হাসপাতাল এবং পথশিশুদের জন্য আবাসিক হোস্টেল আমাদের বড় প্রাপ্তি।’

খুলনা ও নওগাঁ থেকে এসে আবাসন সুবিধা পাওয়া কয়েকজন বাসিন্দাও জানান, ফাদার বেঞ্জামিনের সহায়তায় তারা ভাড়া বাসার কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছেন এবং সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে পেরেছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সমাজ উন্নয়নে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদকবিরোধী সচেতনতা এবং শিক্ষার প্রসারে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন ফাদার বেঞ্জামিন গোমেজ। তার এই দীর্ঘ মানবিক অবদান ভালুকায় উন্নয়ন, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close