রাজধানী ঢাকার ওপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক চাপ কমাতে বিভাগীয় শহর, জেলা সদর এবং উপজেলা পর্যায়ে বন্ধ ও রুগ্ন শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনে সরকারের আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকেরা। তাদের মতে, রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন কাঠামোর কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পায়নের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও নাগরিক সুবিধার বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে যানজট, বায়ুদূষণ, আবাসন সংকট, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ এবং নাগরিক সেবার মান অবনতির মতো সমস্যা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশের বহু জেলায় একসময় প্রতিষ্ঠিত শিল্পকারখানাগুলো নানা কারণে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। এসব শিল্প পুনরায় চালু করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, মানুষের রাজধানীমুখী প্রবণতা কমবে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের বড় অংশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কারখানা পুঁজি সংকট, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, ব্যবস্থাপনা সমস্যা, ঋণের উচ্চ সুদ, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজার সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত আকারে পরিচালিত হচ্ছে।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন শিল্পনগরী ও বিসিক শিল্পনগরীতে শত শত প্লট দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় আছে। অনেক উদ্যোক্তা ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে উৎপাদনে ফিরতে পারেননি। আবার কোথাও বিদ্যুৎ, গ্যাস, সড়ক ও বন্দরসংযোগের অভাবও শিল্প স্থবিরতার অন্যতম কারণ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, উচ্চশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ রাজধানীতে আসছে। কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনযাত্রার আশায় এই অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ঢাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। তাদের মতে, শিল্পায়নকে যদি কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক রাখা হয়, তাহলে আঞ্চলিক বৈষম্য আরও বাড়বে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিল্প পুনরুজ্জীবন হলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং ঢাকামুখী জনস্রোত অনেকটাই কমে আসবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক কারখানার ভবন, যন্ত্রপাতি ও জনবল কাঠামো এখনও রয়েছে। সামান্য নীতিগত সহায়তা ও অর্থায়ন পেলে এগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব। রুগ্ন শিল্পকে সচল করতে স্বল্পসুদে ঋণ, কর ছাড়, প্রযুক্তি আধুনিকায়ন, দক্ষ জনবল প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা জরুরি। বিশেষ করে যেসব কারখানা অল্প সহায়তায় দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্বাসন করা উচিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব সম্পদ ও কৃষিপণ্যের ওপর ভিত্তি করে শিল্প গড়ে তুললে তা টেকসই হবে। উত্তরাঞ্চলে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, দক্ষিণাঞ্চলে মৎস্য ও লবণভিত্তিক শিল্প, চট্টগ্রাম অঞ্চলে জাহাজভাঙা ও প্রকৌশল শিল্প, সিলেটে চা ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে দুগ্ধ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ ধরনের শিল্পের মাধ্যমে কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, অপচয় কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। এছাড়া, অনেক শিল্পনগরীতে জমি বরাদ্দ থাকলেও উৎপাদন শুরু হয়নি। এসব প্লট পুনর্মূল্যায়ন করে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করা প্রয়োজন।
রুগ্ন শিল্প পুনরুজ্জীবনে ব্যাংকগুলোর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণের কারণে নতুন অর্থায়ন পাচ্ছে না। এজন্য পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ এবং বিশেষ পুনর্বাসন তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শিল্প পুনরুজ্জীবন নয়; এর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ-গ্যাস, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নও জরুরি। আঞ্চলিক শিল্পায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করলে রাজধানীর ওপর চাপ কমবে এবং সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে ঢাকার একক আধিপত্য কমবে। এতে রাজধানী আরও বাসযোগ্য হবে এবং জাতীয় অর্থনীতি হবে অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এফবিসিসিআইসহ অন্যান্য ব্যবসায়ী নেতারা। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা সুদের হার পর্যায়ক্রমে একক অঙ্কে নামিয়ে স্থিতিশীল করার দাবি জানান, যাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় এবং শিল্প খাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে। এ ছাড়া তারা রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) বর্তমান ২.২০ বিলিয়ন ডলার থেকে ৫ বিলিয়নে বাড়ানো এবং পরবর্তীতে ৮ বিলিয়ন করার প্রস্তাব দেন। ঋণ খেলাপির সময়সীমা ৩ মাস থেকে ৬ মাসে বাড়ানো, এক প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে অন্যটিকে খেলাপি না করা, ঋণ পুনঃতফসিলের পরের সময়সীমা ৪-৫ বছর থেকে ১০ বছর করা এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে কম সুদে ঋণ সুবিধা চালু করার মতো দাবিও উত্থাপিত হয়। গভর্নর এসব দাবি শুনে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন, যা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও দেশের শিল্প খাত পুনরুদ্ধার ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছে। সংগঠনের সভাপতি আনওয়ারুল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ১২ বছরের ঋণব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যেখানে ২ বছরের মোরাটোরিয়াম থাকবে। কারণ, দেশের ক্যাপিটাল মার্কেট এখনো পুরোপুরি পরিপক্ব নয়। পাশাপাশি ক্যাপিটাল মেশিনারির জন্য অফশোর ফান্ড থেকে কম সুদে রিফাইন্যান্সিং সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার, যা বিডার অনুমোদনের আওতায় থাকতে পারে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল আনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করা উচিত।
তিনি বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, সুদের হার বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে পড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকরী মূলধনের সীমা পুনর্মূল্যায়ন, এলসি খাতের বকেয়া অর্থ দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তর এবং বিদেশি মুদ্রায় স্বল্পসুদে কার্যকরী মূলধন গ্রহণের অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে ঋণ শ্রেণিবিন্যাসের সময়সীমা ৩ মাস থেকে বাড়িয়ে ৬ মাস করার দাবি জানান তিনি।
আনওয়ারুল আলম চৌধুরী শিল্প উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১১ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা, দণ্ড সুদ প্রত্যাহার, চক্রবৃদ্ধির পরিবর্তে সরল সুদ চালু, সুদ আরোপের সময়সীমা অর্ধবার্ষিক করা এবং ব্যাংক কমিশন ও চার্জ কমানোর সুপারিশ করেন। এ ছাড়া সিআইবি রিপোর্টে গ্রুপভিত্তিক মূল্যায়নের পরিবর্তে প্রতিটি কোম্পানিকে পৃথক সত্তা হিসেবে বিবেচনার দাবি জানানো হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সহজ অর্থায়নের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক পাইলট প্রকল্প চালু এবং অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্স শর্ত শিথিল করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিসিআই আশা প্রকাশ করে, বাংলাদেশ ব্যাংক এসব প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দেশের উৎপাদন খাত পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় সচল করতে সরকারের বিশেষ তহবিল গঠনের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কারখানা নির্বাচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই অর্থের অপব্যবহার না হয়।
একই সঙ্গে তিনি বর্তমানে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রতিকূলতার মুখে টিকে থাকার সংগ্রাম করা কারখানাগুলোকে বিশেষ নীতি সহায়তা প্রদানের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছেন। তার মতে, এ ধরনের সহায়তা দেওয়া গেলে বহু কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে এবং এর মাধ্যমে লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকবে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব অ.দা. (বিসিক, এসএমই ও বিটাক) মো. নূরুজ্জামান বলেন, রুগ্ন শিল্প চিহ্নিত করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এফবিসিসিআইসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
তিনি বলেন, এ ধরনের সমস্যার সমাধানে সব পর্যায়ের শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সমস্যা চিহ্নিত করার পর যে সুপারিশগুলো আসে, সেগুলোর ভিত্তিতে শিল্প মন্ত্রণালয় নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রদান করে।
কেকে/এলএ