পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সীমান্তে আগ্রাসী তৎপরতা বাড়িয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী- বিএসএফ। এমনকি নববিনর্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শপথের আগের রাতেই মৌলভীবাজার সীমান্তে গুলি চালিয়ে দুই বাংলাদেশিকে হত্যা করে বাহিনীটি।
এ ছাড়া শপথ নিয়েই মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণের জন্য বিএসএফকে জমি বরাদ্দের অনুমোদন দেন শুভেন্দু অধিকারী। ভারতের এই উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড ও সীমান্তে হত্যার ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ছে বাংলাদেশে। এ নিয়ে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চরম অবনতি হয়। বিশেষ করে বিজেপি ও উগ্রপন্থি সংগঠনগুলোর উসকানিতে দুই দেশের সম্পর্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে সীমান্তে আগ্রাসী হয়ে ওঠে বিএসএফ। বাড়তে থাকে সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের মতো ঘটনা।
তবে বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার আসার পর সম্পর্ক ফের স্বাভাবিক হতে শুরু করে। পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের ঘটনাও কমে আসে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসায় এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি শুরু হয়েছে। এতে দুই দেশের সম্পর্ক ফের অবনতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের নিরপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
গত শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তে বিএসএফ সদস্যদের ছোড়া গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। একই দিন বিকালে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মুরইছড়া সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে পুশইন করেছে বিএসএফ। এর একদিন পরই, অর্থাৎ শনিবার শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী। শপথ নিয়েই বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
এ সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশকে এখন ভয় দেখানোর মতো কোনো জায়গা নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না, সরকারও কাঁটাতার ভয় পায় না। যেখানে আমাদের কথা বলা দরকার, আমরা কথা বলব। তিনি আরও জানান, ভারতে বসে শেখ হাসিনা যাতে বাংলাদেশে কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম করতে না পারে, ভারত সরকার তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এদিকে সীমান্ত হত্যা ও কাঁটাতারের বেড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি)। দলটির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে এবং নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে কোনো দেশের সঙ্গেই প্রকৃত বন্ধুত্ব হতে পারে না। তিনি বলেন, সীমান্তে বাংলাদেশের জনগণকে হত্যা করে কেউ যদি বন্ধুত্বের কথা বলে, তবে সেই বন্ধুত্ব সম্ভব নয়। এই কাঁটাতার একদিন সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণই উপড়ে ফেলে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষা করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। যদি সরকার এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে দেশের জনগণই সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেবে। একইসঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি জানান, বাংলাদেশকে কোনো দেশের করদ রাজ্য হিসেবে দেখতে চায় না এ দেশের মানুষ।
এদিকে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত যেভাবে ঘোষণা দিয়েছে, তাতে নিরাপত্তার চেয়ে রাজনীতি বেশি বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ। ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, ‘ভারত তাদের সীমান্তে কী করবে না করবে, তা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু বাংলাদেশ সীমান্তে কোনো ধরনের বর্বরতা করা যাবে না। পরিবর্তিত বাংলাদেশ সীমান্তে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক হত্যাকে আর মেনে নেবে না।’
মাওলানা ইউনুস আহমদ বলেন, একই ভাষাভাষী দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার সীমান্তে আইনের ফাঁক গলে নানা কর্মকাণ্ড হয়; উভয় দেশের নাগরিকরাই এসবের সঙ্গে জড়িত থাকে। এসব কর্মকাণ্ডের আর্থিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের ক্ষতিই বেশি।
সীমান্তে বিএসএফের ভূমিকা প্রসঙ্গে ইউনুস আহমদ বলেন, ‘আমাদের সাহসী সীমান্তরক্ষী বাহিনী অতন্দ্রপ্রহরী হয়ে সীমানা পাহারা দেয়। এ ক্ষেত্রে বিএসএফও যদি ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, তাহলে সীমান্ত নিরাপদ হবে। কিন্তু বিএসএফের অতীতের আচরণ আমাদের ক্ষুব্ধ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতা গ্রহণের পর পরিস্থিতির উন্নতি আশা করছি এবং অবনতি হলে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করছি।’
কেকে/ এমএস