ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত ৮ মে দুই বাংলাদেশিকে সীমান্তে গুলি করে হত্যা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে গত ছয় দিনে তিন বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করেছে বিএসএফ। পাশাপাশি পুশইনও চালাচ্ছে বাহিনীটি। এদিকে বিএসএফের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় সীমান্তজুড়ে সতর্কতা বাড়িয়েছে বিজিবি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ সীমান্তে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছেই বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা দিয়ে। তাদের উসকানিতে সীমান্তে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বিএসএফ। এতে বাংলাদেশে প্রাণহানি বাড়ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারান খাদেমুল ইসলাম। তিনি গোতামারী ইউনিয়নের উত্তর আমঝোল গ্রামের আমজাদ হোসেনের ছেলে।
স্থানীয়রা জানান, গতকাল ভোরে খাদেমুল ইসলামসহ কয়েকজন ব্যক্তি বনচৌকি বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তের ৯০৫/৬-এস পিলারসংলগ্ন এলাকায় যান। এ সময় ভারতের ৭৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের পাগলামারী ক্যাম্পের টহল দল তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে খাদেমুলের মুখ, বুক ও মাথায় গুলি লাগে। সঙ্গীরা তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রংপুরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকালে তার মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ঘটনায় বিজিবির পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানিয়ে বিএসএফকে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তে বিএসএফ সদস্যদের ছোড়া গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। একই দিন বিকেলে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার মুরইছড়া সীমান্ত দিয়ে ১০ জনকে পুশইন করেছে বিএসএফ। এর একদিন পর, অর্থাৎ গত শনিবার শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী। শপথ নিয়েই বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
সীমান্তে বিজিবির কড়া নজরদারি
কুড়িগ্রামের ১৯৮ কিলোমিটার সীমান্তে বিজিবির কড়া নজরদারি চলছে। অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্ত এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কুড়িগ্রাম ব্যাটালিয়ন (২২ বিজিবি) তাদের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি ও টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে। গতকাল সকালে এসব তথ্য জানান কুড়িগ্রাম ব্যাটালিয়নের (২২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মাহবুব-উল-হক, পিএসসি।
বিজিবি সূত্র জানায়, সীমান্ত এলাকায় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলা, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিশেষ টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ব্যাটালিয়নের অধীন প্রতিটি বিওপি (বর্ডার আউট পোস্ট) থেকে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে সীমান্তে টহল পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বাড়তি নজরদারি বসানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক গতিবিধি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় সদস্যদের সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম ব্যাটালিয়ন (২২ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মাহবুব-উল-হক বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্ত চোরাচালান বন্ধ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ দমনে বিজিবি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সীমান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে বিজিবির তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশকে এখন ভয় দেখানোর মতো কোনো জায়গা নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না, সরকারও কাঁটাতার ভয় পায় না। যেখানে আমাদের কথা বলা দরকার, আমরা কথা বলব।
তিনি আরও জানান, ভারতে বসে শেখ হাসিনা যাতে বাংলাদেশে কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারেন, সে বিষয়ে ভারত সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সীমান্ত হত্যা ও কাঁটাতারের বেড়ার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি)। দলটির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে এবং নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে কোনো দেশের সঙ্গেই প্রকৃত বন্ধুত্ব হতে পারে না। তিনি বলেন, সীমান্তে বাংলাদেশের জনগণকে হত্যা করে কেউ যদি বন্ধুত্বের কথা বলে, তবে সেই বন্ধুত্ব সম্ভব নয়। এই কাঁটাতার একদিন সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণই উপড়ে ফেলে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষা করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। যদি সরকার এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে দেশের জনগণই সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেবে। একই সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি জানান, বাংলাদেশকে কোনো দেশের করদরাজ্য হিসেবে দেখতে চায় না এ দেশের মানুষ।
এদিকে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত যেভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তাতে নিরাপত্তার চেয়ে রাজনীতি বেশি বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ।
ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, ‘ভারত তাদের সীমান্তে কী করবে, না করবে, তা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু বাংলাদেশ সীমান্তে কোনো ধরনের বর্বরতা করা যাবে না। পরিবর্তিত বাংলাদেশ সীমান্তে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক হত্যাকে আর মেনে নেবে না।’
মাওলানা ইউনুস আহমদ বলেন, একই ভাষাভাষী দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার সীমান্তে আইনের ফাঁক গলে নানা কর্মকাণ্ড হয়; উভয় দেশের নাগরিকরাই এসবের সঙ্গে জড়িত থাকে। এসব কর্মকাণ্ডের আর্থিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের ক্ষতিই বেশি।
সীমান্তে বিএসএফের ভূমিকা প্রসঙ্গে ইউনুস আহমদ বলেন, ‘আমাদের সাহসী সীমান্তরক্ষী বাহিনী অতন্দ্র প্রহরী হয়ে সীমানা পাহারা দেয়। এ ক্ষেত্রে বিএসএফও যদি ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, তাহলে সীমান্ত নিরাপদ হবে। কিন্তু বিএসএফের অতীতের আচরণ আমাদের ক্ষুব্ধ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতা গ্রহণের পর পরিস্থিতির উন্নতি আশা করছি এবং অবনতি হলে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করছি।’
কেকে/এলএ