কুরবানি ইসলামী শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবাই করার আমল, যা প্রতি বছর ঈদুল আজহার সময় আদায় করা হয়। হজরত ইব্রাহিম (আ:)-এর মহান ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে প্রতি বছর মুসলমানরা কুরবানি দেন।
আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কুরবানি নির্ধারণ করেছি, যেন তারা আল্লাহর দেওয়া পশুর ওপর তাঁর নাম স্মরণ করে কুরবানি করে।’ (সূরা হজ, আয়াত ৩৪) কুরবানির চামড়া শুধু পশুর একটি উপাদান নয়, এটি ধর্মীয় অনুশাসনের একটি অনুষঙ্গ, অর্থনৈতিক সম্পদ এবং সামাজিক কল্যাণের উৎস।
এই কুরবানির পশুর চামড়া ব্যবহারের রয়েছে ইসলামী বিধান। চামড়া বিক্রির অর্থ নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করা জায়েজ নয়। এটি সদকা বা আল্লাহর পথে দান করার জন্য নির্ধারিত। গরিব-দুস্থ, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে দান করা উত্তম।
কুরবানির চামড়া কুরবানিদাতা বিক্রি বা ব্যবহার করতে না পারলেও এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে। মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো সাধারণত কুরবানির চামড়ার অর্থ দিয়ে বছরের একটি বড় অংশের খরচ চালায়। বাংলাদেশে যদি ইসলামী মূল্যবোধ বজায় রেখে চামড়া রফতানি বা চামড়াভিত্তিক শিল্প (লেদার গুডস, জুতা) গড়ে তোলা যায়, তাহলে প্রতি বছর পাঁচ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।
চামড়াশিল্পের সংকট কাটাতে সরকার আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহায় নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। ঈদ সামনে রেখে পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে শৃঙ্খলা আনতেও নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিবছরই চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়া, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং সংরক্ষণ সংকট নিয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা কাটাতেই এবার আগাম প্রস্তুতি ও কঠোর ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কুরবানির পশুর চামড়ার নতুন দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। এবারের সিদ্ধান্তে লবণযুক্ত গরুর চামড়ায় প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা এবং খাসির চামড়ায় ৩ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এ বছর ঢাকা মহানগরের ভেতরে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকার বাইরে এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। গত বছর গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা ছিল। সে হিসেবে এ বছর প্রতি বর্গফুটে দাম ২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া এ খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ নীতিতে বড় ধরনের শিথিলতা এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি জারি করা এক বিশেষ সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এখন থেকে চামড়া ব্যবসায়ীরা আগের ঋণের বকেয়া কিস্তি পরিশোধ ছাড়াই নতুন ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম সচল রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, যেসব ব্যবসায়ীর ঋণ পুনঃতফসিল বা রিশিডিউল করা রয়েছে, তাদের নতুন ঋণ পেতে আগের বকেয়ার নির্দিষ্ট অংশ পরিশোধের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এ বিশেষ সুবিধা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, চামড়াশিল্প দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী খাত। যেহেতু এ খাতের প্রধান কাঁচামাল কুরবানির ঈদকে ঘিরেই সংগ্রহ করা হয়, তাই এ সময়ে ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থের জোগান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে চামড়া খাতের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চলতি মূলধন ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এবারের নির্দেশনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র সংগ্রাহকদের ওপর। যাতে ঋণ সুবিধা শুধু বড় শিল্পপতি বা ট্যানারি মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য হাটবাজার ও গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এ সুবিধার আওতায় আসবেন বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোকে ২০২৬ সালের জন্য চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা কোনোভাবেই গত বছরের তুলনায় কম রাখা যাবে না।
ঋণের লক্ষ্যমাত্রা এবং তার বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়ার সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে কুরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হওয়া রোধ হবে এবং মাঠ পর্যায়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার ন্যায্য দাম পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী কুরবানি ঈদে কোনো চামড়া যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য ডিসিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মসজিদ-মাদ্রাসার দায়িত্বশীলদের ডেকে প্রশিক্ষণ দেবে সরকার। তারা কুরবানির পর চামড়া সংরক্ষণ করবেন। গত বছর প্রথমবারের মতো চামড়া সংগ্রহে বিভিন্ন মাদ্রাসায় লবণ দেওয়া হলেও এ উদ্যোগের পুরোটা কাজে আসেনি। এমন কিছু মাদ্রাসায় লবণ দেওয়া হয়েছিল, যেসব মাদ্রাসা চামড়া সংগ্রহ করে না।
দেশে এবার কুরবানিযোগ্য পশু রয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এটি এ বছরের সম্ভাব্য চাহিদার চেয়ে ২২ লাখেরও বেশি। এ বছর চাহিদা এক কোটি এক লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর। এ বছর সম্ভাব্য চাহিদার বিপরীতে ২২ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। ফলে কুরবানির পশুর কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই।এবার কুরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী।
এ বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। রাজধানী ঢাকায় থাকবে ২৭টি হাট। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি হাট বসবে। এসব হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালন করবে। এবারও অনলাইনে মিলবে কুরবানির পশু। গত কয়েক বছর ধরেই অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে কুরবানির পশু। বিষয়টি ধীরে ধীরে বেশি জনপ্রিয়ও হয়ে উঠছে।
এবারও অললাইনে বসবে পশুর হাট। সম্প্রতি প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান। গত কয়েক বছরের মতো এবারও কুরবানির সময় অনলাইনে পশু বিক্রি হবে। এ জন্য কোনো খাজনা বা হাসিল নেওয়া হবে না। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে জবাইকৃত লাখ লাখ পশুর চামড়া সংরক্ষণে বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, আশা করা যায়।
সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীবর্গ এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, ট্যানারি মালিক, কুরবানির পশুর হাটের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সবমিলিয়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কুরবানির পশুর হাট বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কুরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ এবং এর যথাযথ সংরক্ষণে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ সবাইকে আশ্বস্ত করেছে। এজন্য সরকার অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও কলাম লেখক
কেকে/ এমএস