রোববার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ৯ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: জ্বালানিতে করপোরেট থাবা      ঐতিহাসিক রায়ে বড় জরিমানার মুখে জাকারবার্গ      প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম চট্টগ্রাম সফরে তারেক রহমান      হরমুজ প্রণালি খুলতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের কঠোর শর্ত      মেসির ক্যারিয়ারের ছায়াসঙ্গী বাবা হোর্হে আর নেই      রোববার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী      এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ সোমবার, জানা যাবে যেভাবে      
খোলাকাগজ স্পেশাল
জ্বালানিতে করপোরেট থাবা
সফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৬ এএম আপডেট: ০৯.০৮.২০২৬ ১০:৪১ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে প্রবেশের সুযোগ দিতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় খাতের কাঠামো বদলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন খসড়া নীতিমালা তৈরির জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) কার্যত মাত্র কয়েকটি কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়েছে।

এ নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ভোক্তা অধিকারকর্মী ও অর্থনীতিবিদরা। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও সরকারের উদ্যোগকে ‘লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের মতো কৌশলগত পণ্য সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে থাকবে, নাকি তা ধীরে ধীরে কয়েকটি বড় করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হবে?

তাড়াহুড়ার কারণ কী: বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিক্রির সুযোগ দিতে গত বৃহস্পতিবার বিপিসিকে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। ‘বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা ২০২৬’-এর খসড়া ১০ আগস্টের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ায় বিপিসি কার্যত মাত্র দুই কর্মদিবস সময় পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অথচ এটি এমন একটি নীতিমালা, যার আওতায় দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি থেকে শুরু করে মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বাজারজাতকরণের পুরো কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিমালা তৈরিতে এত অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ার প্রয়োজন হলো কেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়নের আগে বাজার বিশ্লেষণ, প্রতিযোগিতা কাঠামো, মূল্য নির্ধারণ, ভর্তুকি, অবকাঠামো, কর ও শুল্ক, ভোক্তা অধিকার, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত সমীক্ষা প্রয়োজন।

সরকারি সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কার স্বার্থ: এ তাড়াহুড়াকে ঘিরে সরকারের ভেতরে একটি প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের বা ঘনিষ্ঠ কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থে জ্বালানি খাতকে বেসরকারি অপারেটরদের জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়ে সরকারকে প্রভাবিত করা হচ্ছে।

দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের অনুমতি দেওয়ার আবেদন পর্যালোচনার জন্য বিপিসি ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ওই কমিটি গত ২১ জুলাই প্রতিবেদন দিয়ে এ খাত বেসরকারি অপারেটরদের জন্য উন্মুক্ত না করার সুপারিশ করে।

এর মাত্র পাঁচ দিন পর বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা হয়। এ দুই ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। কিন্তু ঘটনাগুলোর সময়গত নৈকট্য এবং এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত হবে—কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ থাকলে তা খতিয়ে দেখা এবং নীতিমালা তৈরির পুরো প্রক্রিয়া জনসম্মুখে প্রকাশ করা।

রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে করপোরেট একচেটিয়া: সরকারের যুক্তি হতে পারে, বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে এবং ভোক্তারা কম দামে জ্বালানি পেতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জ্বালানি তেল আমদানি কোনো সাধারণ পণ্য আমদানির মতো নয়।

গভীর সমুদ্রবন্দর, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন, জাহাজ হ্যান্ডলিং সুবিধা, বিপুল ব্যাংকিং সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির প্রয়োজন হয়। ফলে এ খাতে প্রবেশের সক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই সীমিত থাকবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে প্রকৃত প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার বদলে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর হাতে বাজার কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ আশঙ্কাই প্রকাশ করে বলেছেন, রাষ্ট্রীয় একচেটিয়ার পরিবর্তে ‘বেসরকারি একচেটিয়া’ তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি তেল শুধু একটি বাণিজ্যিক পণ্য নয়। দেশের কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, সড়ক ও নৌপরিবহন, বিমান চলাচল এবং সামগ্রিক অর্থনীতি এর ওপর নির্ভরশীল। এক লিটার ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু একজন ভোক্তার খরচ বাড়ে না। বাড়ে কৃষকের সেচ ব্যয়, পণ্য পরিবহন খরচ, গণপরিবহনের ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপণ্যের দাম। ফলে জ্বালানি বাজারে সামান্য অস্থিরতারও বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে।

এ কারণে বিশ্বের অনেক দেশ জ্বালানি সরবরাহকে পুরোপুরি সাধারণ বাজারের হাতে ছেড়ে দেয় না। বাজারে বেসরকারি অংশগ্রহণ থাকলেও কৌশলগত মজুত, জরুরি সরবরাহ, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সংকটকালীন ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জ¦ালানির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরটি বেসরকারি খাতে গেলে সম্ভাব্য পাঁচ ধরনের বড় ঝুঁকিতে পড়বে দেশ। প্রথমত, মূল্য নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি। বাজারে যদি মাত্র কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান প্রবেশ করে, তারা নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের সুযোগ পেতে পারে। এতে নামমাত্র প্রতিযোগিতা থাকলেও বাস্তবে ভোক্তার জন্য প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি নাও হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সিন্ডিকেট তৈরির আশঙ্কা। বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। জ্বালানি তেলের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে গেলে সিন্ডিকেটের প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে।

তৃতীয়ত, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি। বাংলাদেশের নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা সীমিত। দেশে প্রধান শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি এবং কৌশলগত মজুত সক্ষমতাও সীমিত। যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সমুদ্রপথে সরবরাহ ব্যাহত হওয়া বা বড় কোনো দুর্যোগের সময় বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে রাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে সরবরাহ বজায় রাখতে বাধ্য করতে পারবে—এ প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, দুর্গম ও অলাভজনক অঞ্চলে সরবরাহের সমস্যা। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই লাভজনক বাজারকে অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, দ্বীপ বা দুর্গম এলাকায় জ্বালানি সরবরাহ অনেক সময় বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অন্যতম দায়িত্ব হলো প্রয়োজনের ভিত্তিতে এসব এলাকায়ও সরবরাহ নিশ্চিত করা।

পঞ্চমত, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা। একবার আমদানি, মজুত ও বিপণনের অবকাঠামো বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে গেলে সরকার চাইলেও দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে না। দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেলে সংকটের সময় সরকারের হাতে কার্যকর বিকল্প কমে যাবে।

বিপিসিকে অদক্ষ বা লোকসানি দেখিয়ে বেসরকারিকরণের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হলেও এর পুরো চিত্রটি ভিন্ন। জামায়াতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিপিসি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি যথাক্রমে ১ হাজার ৯৮৩ কোটি এবং ৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকা লোকসান করেছিল। অর্থাৎ বিপিসির আর্থিক ফলাফল বাজার পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক তেলের দাম এবং সরকারের মূল্যনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিতে দেশের ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে সরকার যদি জ্বালানির দাম পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় না করে, তাহলে বিপিসির ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হওয়া উচিত—বিপিসির কাঠামোগত দুর্বলতা কোথায় এবং কীভাবে তা সংস্কার করা যায়; সরাসরি পুরো বাজার বেসরকারি খাতে তুলে দেওয়া কি তার একমাত্র সমাধান?

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম তামিম মনে করেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে তার আগে নিয়ন্ত্রক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রভাব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন। তার মতে, আমদানি এক বিষয়, আর বিপণন আরেক। বর্তমান বিতরণব্যবস্থা বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে। বেসরকারি অপারেটরদের জন্য নতুন একটি ব্যবস্থা রাতারাতি তৈরি করা সম্ভব নয়।

এম তামিম বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারি উভয়পক্ষকে এ খাতে কার্যক্রমের সুযোগ দেওয়া হলে মূল্য নির্ধারণ, প্রতিযোগিতা, বাজারে প্রবেশাধিকার ও বিতরণব্যবস্থা নিয়ে স্পষ্ট কাঠামো থাকা প্রয়োজন।’ চার দিনের মধ্যে বাস্তবসম্মতভাবে এমন একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি করা সম্ভব কি না—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হওয়ায় এটি মুনাফার খাত না করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে সীমিত মুনাফায় পরিচালনা করাই জনস্বার্থসম্মত।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর আগে ভোক্তা সুরক্ষা, জাতীয় স্বার্থ এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। তার মতে, কৌশলগত জ্বালানি অবকাঠামো কার্যকর রাষ্ট্রীয় তদারকির আওতায় থাকা উচিত।

ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক মঞ্জার-ই-খোরশেদ আলম চার দিনের সময়সীমাকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘সরকার অনেক সময় স্বল্প সময়সীমা নির্ধারণ করে, পরে তা বাড়ানো হয়। মাত্র চার দিনে এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রায় অসম্ভব।’ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে চলমান অস্থিরতার মধ্যে এ খাত বেসরকারি অপারেটরদের জন্য উন্মুক্ত করা কতটা বিচক্ষণ হবে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সভাপতি অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদও প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, বেসরকারি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিবর্তে জ্বালানি আমদানি ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা উচিত। তিনি সতর্ক করে বলেন, বেসরকারি আমদানিকারকদের ওপর বেশি নির্ভরতা তৈরি হলে জ্বালানি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হতে পারে।

দরপত্রের সময় ৪২ দিন থেকে ১০ দিন: জ্বালানি খাতের সাম্প্রতিক আরেকটি সিদ্ধান্তও আলোচনায় এসেছে। জামায়াতে ইসলামীর দাবি, ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক বড় সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে যেতে পারে এবং দরদাতা সংকট তৈরি হলে দাম বাড়ার পাশাপাশি সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

সরকারের দৃষ্টিতে দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করা জরুরি হতে পারে। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে স্বচ্ছতার ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান জরুরি। কারণ জ্বালানি তেল আমদানির মতো হাজার হাজার কোটি টাকার বাজারে দরপত্রের প্রতিটি ধাপ যত বেশি প্রতিযোগিতামূলক হবে, রাষ্ট্র ও জনগণের অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি তত কমবে।

সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াত দাবি করেছে, গত ২ আগস্ট বাঙ্কারিং নীতিমালায় পরিবর্তন এনে মেরিন ফুয়েল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে এখন পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি, মজুত, পরিবহন ও বিপণনে বেসরকারি অংশগ্রহণের নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ যুক্ত হয়েছে।

একটি বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত হিসেবে বিষয়গুলো দেখলে হয়তো ঝুঁকি কম মনে হতে পারে। কিন্তু সবগুলো সিদ্ধান্তকে একই ধারাবাহিকতায় দেখলে প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্র কি ধীরে ধীরে জ্বালানি খাতের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে যাচ্ছে? যদি তাই হয়, তাহলে এর চূড়ান্ত সুফল কে পাবে এবং ঝুঁকির বোঝা কে বহন করবে—এ প্রশ্নের উত্তর জনগণের সামনে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন—জ্বালানি খাত কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক খাত নয়। এটি একটি দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। এ খাতে সংস্কারের প্রয়োজন থাকলে সংস্কার হোক। দুর্নীতি থাকলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হোক। বিপিসিতে অদক্ষতা থাকলে প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক করা হোক। বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন থাকলে সুনির্দিষ্ট ও সীমিত ক্ষেত্র নির্ধারণ করে প্রতিযোগিতামূলকভাবে সুযোগ দেওয়া হোক। কিন্তু একটি রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে যদি করপোরেট গোষ্ঠীর একচেটিয়া তৈরি হয়, তাহলে সেটি সংস্কার নয়—শুধু মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের হাতবদল।

আর যদি সত্যিই কোনো প্রভাবশালী মহল নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে রাষ্ট্রীয় নীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে সেটি শুধু জ্বালানি মন্ত্রণালয় বা বিপিসির প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি জনস্বার্থ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। তাই জ্বালানি খাতের দরজা খোলার আগে সবচেয়ে জরুরি হলো—কার জন্য দরজা খোলা হচ্ছে, কী শর্তে খোলা হচ্ছে এবং দরজা খোলার পর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এই তিনটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর জনগণকে দেওয়া।

জ্বালানি খাতে প্রতিযোগিতা দরকার, কিন্তু করপোরেট আধিপত্য নয়। বিনিয়োগ দরকার, কিন্তু জবাবদিহিহীন হস্তান্তর নয়। সংস্কার দরকার, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ধ্বংস করে নয়। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সম্পদ নয়; এটি রাষ্ট্রের এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের সম্পদ।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  জ্বালানি খাত  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close