জাতীয় সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রস্তাব করছে পরিকল্পনা কমিশন। এর মধ্যে মূল এডিপির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
জানা যায়, নতুন এডিপিতে মোট ১ হাজার ১৫০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৫০ হাজার কোটি টাকা। অন্যদের মধ্যে নতুন এডিপিতে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, কৃষি কার্ডের জন্য ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং মসজিদ ও ধর্মীয় উপাসনালয় খাতে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আজ সোমবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে। রাজধানীর পরিকল্পনা কমিশনের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় উন্নয়ন বাজেট চূড়ান্ত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভায় সভাপতিত্ব করবেন।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শুধু একটি উন্নয়ন বাজেট নয়; বরং আগামী দিনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি সমন্বিত রূপরেখা। প্রস্তাবিত এডিপি আজ সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদন পেতে পারে। অনুমোদন পেলে আগামী ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকর হবে।
জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপি প্রণয়নে সরকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রাধিকারকে সামনে রেখেছে। এর প্রধান লক্ষ্য হলো সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা এবং উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরে পৌঁছে দেওয়া। এডিপির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীও উন্নয়নের মূল ধারায় যুক্ত হতে পারে। একইসঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা যায়।
এ ছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্প্রসারণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এডিপির আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সহায়ক প্রকল্প বাস্তবায়ন।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, নতুন প্রকল্প নির্বাচনকালে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরির বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ অর্থায়নে বেশি জোর
প্রস্তাবিত ৩ লাখ কোটি টাকার মূল এডিপির মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা আসবে সরকারি তহবিল থেকে। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে। অর্থাৎ, মোট অর্থায়নের প্রায় ৬৩ শতাংশই আসবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং প্রায় ৩৭ শতাংশ বৈদেশিক সহায়তা থেকে। সরকার উন্নয়ন ব্যয়ে নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। একইসঙ্গে বিদেশি ঋণ ও অনুদাননির্ভর বড় অবকাঠামো প্রকল্পও চলমান থাকবে।
গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বড়
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সেই তুলনায় আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপি প্রায় ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ বড়। পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অর্থনীতির গতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বড় প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার লক্ষ্যেই এ উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ।
পরিবহন ও যোগাযোগে সর্বোচ্চ বরাদ্দ
খাতভিত্তিক বরাদ্দে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। এ খাতে ৫০ হাজার ৯২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট মূল এডিপির প্রায় ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। এ অর্থ দিয়ে সড়ক, সেতু, মহাসড়ক, রেলপথ ও নৌযোগাযোগের উন্নয়ন, চলমান বড় প্রকল্প সমাপ্তি এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
শিক্ষা খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ
মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা খাতে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি ১২ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। মোট এডিপির প্রায় ১৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ এই খাতে ব্যয় হবে। প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষার বিস্তার এবং ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে এ অর্থ ব্যয় করা হবে।
স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগ
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ অর্থ দিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ, বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ এবং জনস্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে অব্যাহত গুরুত্ব
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারই এ খাতের মূল লক্ষ্য।
গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা
গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৩৬১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। পরিকল্পিত নগরায়ন, আবাসন সুবিধা, পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে এ অর্থ ব্যয় হবে।
সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত বিভাগ
মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক বরাদ্দে স্থানীয় সরকার বিভাগ সর্বোচ্চ ৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি ১০ লাখ টাকা পেয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ অবকাঠামো, সড়ক, সেতু, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ পেয়েছে ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পেয়েছে ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ পেয়েছে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পেয়েছে ১৯ হাজার ৪৪০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মোট ১ হাজার ১২১টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমের ব্যাপকতা ও বৈচিত্র্যকে প্রতিফলিত করে। এর মধ্যে ৯৭১টি হলো বিনিয়োগ প্রকল্প, যেগুলোর মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণ, সামাজিক উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল খাতে সরাসরি বিনিয়োগ করা হবে। এ ছাড়া ১০৭টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প রাখা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, নীতিগত সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়ন। স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ৪৩টি প্রকল্প। এর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় ৮০টি প্রকল্প তালিকাভুক্ত রয়েছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বড় আকারের অবকাঠামো ও সেবা খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ প্রকল্পগুলোর সমন্বিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নই সরকারের মূল লক্ষ্য।
২২৩টি প্রকল্প শেষ করার নির্দেশ
প্রকল্প দীর্ঘসূত্রতা কমাতে আগামী জুনের মধ্যে ২২৩টি প্রকল্প অবশ্যই সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ১ হাজার ২৭৭টি নতুন অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে, যা প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে অনুমোদন দেওয়া হবে।
বাস্তবায়ন হার নিয়ে উদ্বেগ
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা কম। অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন মনে করছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, ক্রয় প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং বৈদেশিক সহায়তা ছাড়ে বিলম্ব এর অন্যতম কারণ।
নতুন প্রকল্পে কঠোর শর্ত
নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশন কয়েকটি কঠোর নির্দেশনা নির্ধারণ করেছে, যাতে উন্নয়ন কার্যক্রম আরও কার্যকর, বাস্তবসম্মত এবং টেকসই হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়া কোনো বড় প্রকল্প অনুমোদন না দেওয়া, যাতে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো যায় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নযোগ্যতা নিশ্চিত করা হয়। একই ধরনের ছোট ছোট প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং উন্নয়নের প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মাধ্যমে অর্থায়নের চাপ কমানো এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা গ্রহণের সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে যায়। প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে অতিরিক্ত ব্যয় ও সময়ক্ষেপণ এড়ানো যায়। প্রতিটি প্রকল্পের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, যাতে উন্নয়ন কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এডিপির সফল বাস্তবায়ন হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং দেশের অবকাঠামো আরও শক্তিশালী হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদের মান উন্নত করবে। একইসঙ্গে জলবায়ু সহনশীল প্রকল্প দেশের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সহায়ক হবে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের মান, সময়ানুবর্তিতা এবং ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত না হলে বড় বরাদ্দ প্রত্যাশিত সুফল নাও দিতে পারে।
কেকে/এলএ