দালালচক্রের ফাঁদে পড়ে রাশিয়া গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন বহু বাংলাদেশি তরুণ। ভালো চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে তাদের ইউক্রেন যুদ্ধে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে অনেকেই নিহত, নিখোঁজ বা পঙ্গু হয়ে পরিবারে নেমেছে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তা।
সর্বশেষ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন হামলায় আবদুর রহিম নামের ময়মনসিংহের এক যুবক নিহত হয়েছেন। পরিবারের দাবি, ভালো বেতনের কথা বলে তাকে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু দালালচক্র তাকে ধোঁকা দিয়ে রুশ সেনাবাহিনীতে পাঠিয়ে দেয়। গত ১১ মে সন্ধ্যায় পরিবারের কাছে আবদুর রহিমের মৃত্যুর খবর পৌঁছায়।
ছেলেকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা রমিছা খাতুন। আহাজারি করে তিনি বলেন, ‘আমার পুতে এক বছর ধইরা ওয়েল্ডিংয়ের কাম করতাছিন (করছিল)। দালাল ওই কোম্পানি থেইকা তাকে সৈনিকে নিয়া গেছে। আমরা কিছুই জানতাম না। ওরা আমার কলিজার টুকরারে শেষ কইরা দিল।’
স্বজনরা জানান, গত ২ মে প্রতিপক্ষের ড্রোন হামলায় আবদুর রহিম নিহত হন। রুশ সেনাবাহিনীতে একই ক্যাম্পে থাকা তার বন্ধু নরসিংদীর লিমন দত্ত ফেসবুক মেসেঞ্জারে কিশোরগঞ্জের তরুণ মো. রিয়াদ রশীদের মৃত্যুর খবর জানান। একইসঙ্গে আবদুর রহিমের মৃত্যুর খবরও রিয়াদের পরিবারের কাছে পাঠান। পরে রিয়াদ রশীদের পরিবার ও লিমন দত্তের মাধ্যমে আবদুর রহিমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয় তার পরিবার।
এর আগে গত মার্চে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ফর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডসের প্রতিবেদনে জানানো হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়েছেন শতাধিক বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৪ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। বর্তমানে সংখ্যাটা বেড়েছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশি পুরুষদের জোরপূর্বক পাঠানো ও মানবপাচারের ঝুঁকি শীর্ষক ৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে প্রতারণা, বলপ্রয়োগ ও নির্যাতনের মাধ্যমে বাংলাদেশি তরুণদের কীভাবে ইউক্রেনে সম্মুখসমরে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে, সেসব তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে শুরু হওয়া রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন এখনো বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। এর সুযোগ নিয়ে আর্থিকভাবে দুর্বল পুরুষদের টার্গেট করে এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে রাশিয়ায় মানবপাচারের একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া চালু হয়েছে।
দালালচক্র মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে— যেমন নিরাপদ চাকরি বা বেসামরিক কাজের সুযোগ— এদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে সরবরাহ করছে। প্রতিবেদনে ফর্টিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলে বলেন, ‘প্রতারণার মাধ্যমে পাচারপূর্বক বাংলাদেশি পুরুষদের ইউক্রেনে রাশিয়ার অবৈধ যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের প্রতি নির্যাতনের মাত্রা সম্ভবত আমরা যা নথিবদ্ধ করতে পেরেছি, তার চেয়েও অনেক বেশি।’
মানবাধিকার সংগঠন দুটির অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, মানবপাচারকারী দালালচক্র প্রথমে ভুয়া কাজের কথা বলে ভুক্তভোগী বাংলাদেশি তরুণদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে প্রলুব্ধ করে। তারপর রুশ ভাষায় লিখিত চুক্তিপত্রে তাদের স্বাক্ষর করায়, যেটি ভুক্তভোগীরা পড়তেও পারে না। এরপর তৃতীয় একটি দেশের মধ্য দিয়ে তাদের পাচার করে দ্রুত রাশিয়ার সামরিক স্থাপনাগুলোতে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে ইউক্রেনে গিয়ে রাশিয়ার পক্ষে সৈন্য হিসেবে যুদ্ধ করতে তাদের বাধ্য করা হয়েছিল।
বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগী একজন বলেছেন, রাশিয়ায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তাকে জানানো হয় যে, তাকে ‘ক্রয়’ করা হয়েছে যুদ্ধ করার জন্য।
বেঁচে যাওয়া কিছু ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, কোনো উল্লেখযোগ্য প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। স্থলমাইন ও ড্রোন আক্রমণে কেউ কেউ আহত হয়েছেন। কিছু ভুক্তভোগী কমান্ডারদের মারধরের শিকার হয়েছেন। তাদের বেতন আটকে রাখা হয়েছে এবং কোনো ছুটিও দেওয়া হয়নি। এমনকি পাসপোর্টও জব্দ করা হয়েছিল। পালানোর চেষ্টা করলে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো।
জানা গেছে, ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে তারা দেশের বিভিন্ন জেলার যুবকদের যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দিচ্ছে। মূলত ঢাকার বাইরের ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সি তরুণ-যুবকদেরই টার্গেট করছে এ নেটওয়ার্ক। প্রথমে স্থানীয় দালালরা বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখায়। পরে তাদের নিয়ে আসা হয় রিক্রুটিং এজেন্সিতে। এসব এজেন্সি বিদেশি কোম্পানিতে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে পাঠায় রুশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায়। সেখান থেকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিভিন্ন ফ্রন্টে অংশ নিতে তাদের বাধ্য করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে কাজ করছে একটি শক্তিশালী চক্র। আরও জানা গেছে, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিদেশে, বিশেষ করে রাশিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলার বাসিন্দা।
প্রথমে তাদের স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে প্রলোভন দেখিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সিতে নেওয়া হয়। এরপর এজেন্সি এক থেকে দেড় লাখ টাকা বেতনের কথা বলে ৫-১১ লাখ টাকার চুক্তি করে। এসব লোকজনকে ‘সিনোপেক ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ রাশিয়া এলএলসি’ নামের একটি চীনা প্রতিষ্ঠানে কাজের কথা বলে পাঠানো হয়, কিন্তু সেখানে পৌঁছেই তারা জানতে পারেন, গন্তব্য আসলে যুদ্ধক্ষেত্র।
চট্টগ্রামের আনোয়ারার ৩০ বছর বয়সি অমিত বড়ুয়া প্রায় ৮ লাখ টাকার বিনিময়ে রাশিয়া পাড়ি দেয়। তিনি ৭ মাস ধরে নিখোঁজ। পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা হয় এপ্রিলের ২৮ তারিখে। তার ভাই সুমিত বড়ুয়া বলেন, তার এক সহকর্মী ভয়েস মেসেজে জানায়, ইউক্রেনে যুদ্ধের সময় রকেট হামলায় অমিত নিহত হয়েছে। ওই ভয়েস বার্তায় শোনা যায়, ‘আমি সোহাগ (মানিকগঞ্জ) ও অমিতের রুমমেট। অমিত আর নেই। রকেট হামলায় ও মারা গেছে, সোহাগ আহত।’ পরে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সোহাগও নিহত হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বলছেন, কেউ কি তাদের স্বামী-সন্তান কিংবা ছেলেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে চাইবে; তা-ও টাকা দিয়ে? আমাদের সবার সঙ্গে দালাল ও এজেন্সি প্রতারণা করেছে। আমাদের স্বামী-সন্তানকে সেনাবাহিনীতে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন তারা কিছু জানে না বলে আবারও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে।
কেকে/এলএ