কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় নিখোঁজের চারদিন পর নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে মো. জিল্লুর রহমান (৪০) নামের এক ব্যবসায়ীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি ঘিরে পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রহস্যজনক এ মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের মাঝে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
সোমবার (১৮ মে) সকালে উপজেলার পৌর এলাকার ভোগপাড়া মহল্লায় কটিয়াদী-কিশোরগঞ্জ সড়কের পাশে অবস্থিত একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
নিহত মো. জিল্লুর রহমান নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চরগোহালবাড়িয়া গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গ্রামের বাড়ি নরসিংদীতে হলেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি পরিবার নিয়ে কটিয়াদী পৌর এলাকায় বসবাস করছিলেন। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার ছিল। স্থানীয়ভাবে তিনি একজন পরিচিত ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কটিয়াদী পৌর এলাকায় তার দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ‘মুন ডিজিটাল স্টুডিও অ্যান্ড কালার ল্যাব’ দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করে আসছিলেন। পাশাপাশি কয়েক বছর আগে ‘অন-টাইম প্লেট অ্যান্ড গ্লাস’ তৈরির কারখানা চালু করেন। ব্যবসার সুবাদে এলাকায় তার পরিচিতিও ছিল বেশ ভালো।
স্বজনরা জানান, প্রতিদিনের মতো শুক্রবার সকালে বাসা থেকে বের হন জিল্লুর রহমান। সকালে পরিবারের সঙ্গে নাস্তা করে তিনি কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যান। দুপুরের দিকে স্ত্রীর সঙ্গে তার সর্বশেষ মোবাইল ফোনে কথা হয়। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান না পেয়ে উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে পরিবারের। চারদিন ধরে কোনো খোঁজ না মেলায় সোমবার সকালে স্ত্রী ও স্বজনরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সেটি খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় মেঝেতে অর্ধগলিত অবস্থায় জিল্লুর রহমানের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে তারা চিৎকার শুরু করেন। পরে স্থানীয়রা ছুটে এসে পুলিশে খবর দেয়।
খবর পেয়ে কটিয়াদী মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। এ সময় কটিয়াদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. তোফাজ্জল হোসেনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
এদিকে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দুই নারী কর্মী মদিনা ও শারমিন জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে তারা সর্বশেষ কারখানায় কাজ করেছিলেন। এরপর আর তাদের ডাকা হয়নি।
তারা বলেন, ‘বৃহস্পতিবার দুপুরে আমরা কাজ শেষ করে চলে যাই। এখানে আরেকজন ড্রাইভারও কাজ করতেন, তবে তার নাম আমরা জানি না। মালামাল আসলে আমাদের ফোন দিয়ে ডাকা হতো। এরপর থেকে আর কোনো ফোন পাইনি।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই ড্রাইভারের খোঁজও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তার পূর্ণ পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি কেউ। বিষয়টি নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
রহস্যজনক এ মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই ধারণা করছেন, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নাও হতে পারে। তবে পুলিশ বলছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। বর্তমানে ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
নিহতের স্ত্রী অন্তরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো শুক্রবার সকালে নাস্তা করে বাসা থেকে বের হন তিনি। দুপুরে শেষবার কথা হয়। এরপর থেকে ফোনে কল দিলেও তিনি আর রিসিভ করেননি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে তার মরদেহ দেখতে পাই।’
চাচাতো ভাই আব্দুল হাশিম বলেন, ‘আমার ভাই খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। কীভাবে এমন ঘটনা ঘটলো আমরা বুঝতে পারছি না। আমরা বারবার ফোন দিয়েছি, ফোন খোলা থাকলেও রিসিভ হয়নি। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে আগে কোনো নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়নি। ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে। পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
কেকে/ এমএস