প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে একের পর এক ‘বদলিবাণিজ্যের’ অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পদায়নের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এসএম. সরওয়ার কামালের আট কোটি টাকার চুক্তিপত্র ও মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) পদে বদলির জন্য আড়াই কোটি টাকার অভিযোগ ঘিরে প্রশাসনে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক তোলপাড়।
সূত্রমতে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পদায়নের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে আট কোটি টাকার একটি চুক্তিপত্র করেন সরওয়ার কামাল। যা প্রকাশ্য আসার পর গত বুধবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-১ শাখার উপসচিব মো. রবিউল ইসলাম চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরওয়ার কামালকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করেন। এ বিষয়ে তাকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।
কারণ দর্শানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে উপসচিব মো. রবিউল ইসলাম গত রোববার গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নোটিস জারির বিষয়টি সত্য। তবে এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতনরা কথা বলবেন।’
সরওয়ার কামালের সঙ্গে ডিসি পদে পদায়নের জন্য চুক্তিপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। জেলা প্রশাসক পদে পদায়নের সঙ্গে আমার সংযোগ নেই। এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।’
এদিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বারবার আলোচনায় আসা চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরওয়ার কামালের চুক্তিপত্রের বিষয়টি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনসহ সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সরওয়ার কামালকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি তিনি।
সরওয়ার কামাল বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা। উপসচিব পদমর্যাদার এ কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি ডেপুটেশনে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন।
সরওয়ার কামালকে দেওয়া শোকজ নোটিসে বলা হয়, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকে উদ্দেশ্য করে আট কোটি টাকার বিনিময়ে কুমিল্লার ডিসি পদে পদায়নের লক্ষ্যে একটি চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের প্রমাণ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে মন্ত্রণালয়।
চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এ ঘটনার সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত।’ সরওয়ার কামালের বিরুদ্ধে রাজস্ব বিভাগে অর্থ আদায়, কর্মচারীদের বেতন থেকে টাকা কেটে নেওয়া, স্কেল প্রদানের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, মিটিং ও পিকনিকের নামে চাঁদা আদায়, সার্কেল ভিজিটের নামে অর্থ সংগ্রহ, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে উপহার গ্রহণসহ বিভাগে দালাল নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করা চুক্তিপত্রে সরওয়ার কামাল নিজেকে উপসচিব ও বর্তমানে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে লিখেছেন, ‘এ মর্মে স্বেচ্ছায় ও সুস্থ মস্তিষ্কে অঙ্গীকার ও সম্মতিপত্র প্রদান করিতেছি যে, জনাব ড. মো. জিয়াউদ্দীন মহোদয়, বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রাম বিভাগ, সরকারের নিকট সুপারিশক্রমে আমাকে কুমিল্লা জেলার জেলা প্রশাসক পদে পদায়নের ব্যবস্থা করিতে সক্ষম হইলে, আমি সানন্দে উক্ত পদে যোগদান করিতে সম্মত থাকিব। সরকার কর্তৃক কুমিল্লা জেলার জেলা প্রশাসক পদে আমার নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হইবার পর আমি সম্মানিস্বরূপ চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মহোদয়কে নগদ ৮ কোটি টাকা মাত্র প্রদান করিব বলিয়া অঙ্গীকার করিতেছি।’
অন্যদিকে আড়াই কোটি টাকার চুক্তি করে এসপি হিসেবে বদলির অভিযোগে মৌলভীবাজারের নতুন পুলিশ সুপার (এসপি) মো. রিয়াজুল ইসলামকে যোগদানের মাত্র সাত দিনের মাথায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত শুক্রবার (১৫ মে) পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত এক আদেশে প্রত্যাহার করা হয়।
আদেশে বলা হয়, মৌলভীবাজারের নতুন পুলিশ সুপার মো. রিয়াজুল ইসলাম জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্বভার অর্পণ করে আগামী ১৬ মে-এর মধ্যে পুলিশ সদর দফতরে রিপোর্ট করবেন। আদেশে প্রত্যাহারের কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে জানতে মৌলভীবাজারের নতুন পুলিশ সুপার মো. রিয়াজুল ইসলামের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।
এসব বিষয়ে কথা হলে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক খোলা কাগজকে বলেন সরকারের মাত্র তিন মাসের মাথায় আমাদের এ ধরনের বিষয় দেখতে হচ্ছে, এটা খুবই দুঃখজনক। কথায় আছে বিড়াল মারলে প্রথম রাতেই মারতে হয়। তাই সরকারকে এসব ব্যাপারে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
একইসঙ্গে যারা এসবের সঙ্গে যুক্ত এবং পেছনে থেকে মদদ দিচ্ছে, বদলি পদায়ন বাণিজ্য করছে, এ ধরনের সিন্ডিকেট একটা না, একাধিক। এগুলোর তথ্য সরকারের আইনশৃঙ্খলা বিভাগের কাছে থাকার কথা। সেই তথ্যনুযায়ী এদের (সিন্ডিকেট) ব্যাপারে তদন্ত করে পুরো সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
কেকে/ এমএস