ঢাকাসহ সারা দেশে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল, ভয়ভীতি, হামলা, সরকারি কাজে বাধা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। এসব ঘটনায় জনমনে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও সমালোচনা। দুই দলের পক্ষ থেকে দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার কথা বললেও তৃণমূলে নেতাকর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না দলগুলো।
এরমধ্যে জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক জেলায় চাঁদাবাজি, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ ও দখলের অভিযোগ উঠেছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক জামায়াত নেতার বাড়ি থেকে খাদ্য অধিদপ্তরের সিলযুক্ত ৯৯ বস্তা সরকারি চাল জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। অভিযুক্ত আবদুস সামাদ স্থানীয় ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি। প্রশাসনের দাবি, সরকারি চাল এভাবে মজুত বা কেনাবেচার সুযোগ নেই।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জাইকা অর্থায়নে বাস্তবায়িত নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পে চাঁদা দাবি, কাজ বন্ধ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জামায়াত নেতা ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অভিযোগ চাঁদা না দেওয়ায় প্রকল্পের কাজে বাধা, শ্রমিকদের ভয়ভীতি এবং ভাঙচুরের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ নির্মাণকাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
পিরোজপুরের নেছারাবাদে একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের জমি দখল করে গাছ লাগানোর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জামায়াত নেতা স্বপন খানের বিরুদ্ধে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের দাবি, তিনি ক্লিনিকসংলগ্ন গাছও কেটে নিয়েছেন। যদিও অভিযুক্ত ব্যক্তি দাবি করেছেন, জমিটি তাদের পূর্বপুরুষের ছিল।
পটুয়াখালীর বাউফলে মাছ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে এক জেলেকে মারধর ও ট্রলার ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট এক নেতার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং নদীতে মাছ ধরতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক সালাহউদ্দিন জিকুকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জামায়াত নেতা মো. শাহজাহানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
রাঙ্গামাটির বরকলে জামায়াত নেতা রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ এনে মামলা করেছেন এক ব্যবসায়ী। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পাল্টা অভিযোগে ওই নেতা দাবি করেছেন, তাকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
মাগুরার মহম্মদপুরে এক প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় স্থানীয় এক শিবিরকর্মীকে আটক করার ঘটনাও এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা তাকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন। ছাত্রশিবিরের স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি সংগঠনের সক্রিয় কর্মী হলেও তার ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় সংগঠন নেবে না।
এদিকে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক দুই তরুণকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ঘটনায় বিতর্কে জড়িয়েছে স্থানীয় বিএনপি। অভিযোগ রয়েছে, বাসস্ট্যান্ড ও টেম্পোস্ট্যান্ড এলাকায় চাঁদা তোলার অভিযোগে আটক শোয়েব মোল্লা ও সোহান মুন্সিকে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব মোল্লা থানায় গিয়ে ‘এলাকার ছেলে’ পরিচয়ে ছাড়িয়ে আনেন। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা শুরু হয়। পরে পুলিশ জানায়, মুচলেকার ভিত্তিতে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে পটুয়াখালীর বাউফলে হানি ট্র্যাপ, ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা আজাহার খানের জামিনে মুক্তির প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আবারও ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছেন। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে।
চাঁদপুরের কচুয়ায় চাঁদাবাজি ও মারধরের মামলায় ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জিয়াউর রহমান সুজনকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবির জেরে এক যুবকের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়।
ভোলার চরফ্যাশনে দোকান দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন আলমগীর মালতিয়ার বিরুদ্ধে। আদালতে করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবি করে না পেয়ে তাকে মারধর করে দোকান দখল করা হয়েছে। যদিও অভিযুক্ত নেতা দাবি করেছেন, এটি পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ।
এরইমধ্যে রাজধানীর কাওরানবাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে তর্কে জড়ালেন সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর দুই সংসদ সদস্য। জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলনের ‘কাওরানবাজারে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়’ এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তার সঙ্গে এই তর্কে জড়িয়ে পড়েন বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মাহমুদা হাবীবা।
গত সোমবার রাজধানীর গুলশানের হোটেল লেকশোরে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট সংলাপে এই বাহাসের ঘটনা ঘটে। এ সময় দুই সংসদ সদস্যকে চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তীব্র বাক্যবিনিময়েও লিপ্ত হতে দেখা যায়।
সংলাপে একজন বক্তার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান দাবি করেন, তার নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১২ এর অন্তর্ভুক্ত রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার কাওরানবাজারে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিন কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়। শুধু কয়েকটি পাইকারি মুরগির দোকান থেকেই মাসে প্রায় ৬০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। তাছাড়া সরকারের এক মন্ত্রীই বলেছেন- সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু হলে সেটা চাঁদাবাজি হয় না। এটাতে চাঁদাবাজরা উৎসাহিত হয়।
নিজের নির্বাচনি এলাকার পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, আমি আসলে চাঁদাবাজ এলাকার এমপি। আমার এলাকার কাওরানবাজারে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি হয়। এই চাঁদাবাজি নিয়ে বলতে গেলে একদিন সময় লাগবে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের এ সদস্য বলেন, যে সরকার পালিয়ে গেছে, আগে সেই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (ঢাকা-১২ এর সাবেক এমপি আসাদুজ্জামান খান কামাল) নিজেই এই চাঁদাবাজিতে জড়িত ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানেও চাঁদাবাজি চলছে, সেটা বন্ধ করা নিয়ে আমি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কথা বলেছি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত। ওপরে তারা রাজনৈতিক নেতা, ভেতরে চাঁদাবাজ। আগের সরকারের লোকরা করত, এখন কারা করছে তা এখানে বলছি না।
এ সময় সংলাপের আরেক বক্তা বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মাহমুদা হাবীবা জামায়াত এমপির বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, একজন এমপি বলছেন, তার এলাকায় চাঁদাবাজি হচ্ছে। অথচ কারা করছেন, তিনি জানেন না। একজন মন্ত্রী কোনো অনুষ্ঠানে কোন প্রসঙ্গে কী বলেছেন, সেটার খণ্ডিত অংশ প্রচার করে এমন চাঁদাবাজির ঢালাও অভিযোগ করা হলো। এটা খুবই দুঃখজনক।
তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের নাম-পরিচয়সহ তালিকা নিয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়া উচিত। টকশো বা গোলটেবিলে বসে অভিযোগ করলেই হবে না।
মাহমুদা হাবীবা আরও বলেন, অবকাঠামোগত সংকটের কারণে এসব অপরাধ ও সমস্যা সমাজে ঢুকে গেছে। তবে আমার এলাকায় কেউ চাঁদাবাজি করলে সে সরকারি দলের হোক বা অন্য দলের- আমি তো কোনো সমঝোতা করব না। আমি পদক্ষেপ নেব, আইনের আশ্রয় নেব। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব। বর্তমান সরকার যে কোনো গঠনমূলক সমালোচনায় উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ পর্যায়ে জামায়াতের এমপি সাইফুল আবারও মাইক নিয়ে বলেন, আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি। এখানে আগেও সরকারি দলের লোকরা চাঁদাবাজি করত, এখনো সরকারি দলের লোকরাই করছে। গত জাতীয় নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে কাওরানবাজারে সহিংস ঘটনা ঘটেছে। যুবদল নেতা মোসাব্বির নিহত হয়েছেন। সেটা তো সবাই দেখেছেন। আর সে সময় তো বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এলাকায় সরেজমিন দেখতে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, শুধু কাওরানবাজার নয়, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড ও তেজগাঁও এলাকায়ও চাঁদাবাজি হচ্ছে। এসব চাঁদাবাজি বন্ধেও সরকারের সহযোগিতা চাইব। এর জবাবে বিএনপির এমপি মাহমুদা বলেন, চাঁদাবাজি হলে মামলা করেন, তদবির নয়। জবাবে সাইফুল বলেন, পুলিশ সরকারি দলের লোকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা নেয় না।
দুই এমপির এমন তর্ক চলাকালে অনুষ্ঠানের সভাপতি ও সঞ্চালক নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক এবং সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এখানে সরকারি ও বিরোধী দলের এমপির মধ্যে যে বিতর্কটা দেখা গেল সেটাও কিন্তু এক ধরনের নতুন ঘটনা ও পরিবর্তন। কোনো একটা ইস্যু নিয়ে সংসদে যেমন আলোচনা হয়, তেমনি এখানেও প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে হলেও গঠনমূলক একটা আলোচনা তো হলো। আমরা যে পরিবর্তন ও সংস্কারের কথা বলছি- এটার মাধ্যমে তারই প্রতিফলন।
কেকে/ এমএস