মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
খোলাকাগজ স্পেশাল
আমূল পরিবর্তন আসছে র‌্যাবে
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ১০:১৪ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দীর্ঘদিন ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, হেফাজতে নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক বিরোধী নেতাকর্মীদের আটক বা তুলে নেওয়ার অভিযোগে সমালোচিত হয়ে আসছে এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। ফলে নতুন আইন, নতুন কাঠামো ও সম্ভাব্য নতুন নামে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। 

মানবাধিকার সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে একটি আধুনিক ও আইনসম্মত এলিট ফোর্স গঠনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। 

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে র‌্যাব একটি অস্থায়ী বা অ্যাডহক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এ অবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাহিনীটির দায়িত্ব, ক্ষমতা, জবাবদিহিতা এবং তদারকি ব্যবস্থাকে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে। একইসঙ্গে বাহিনীর নাম পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘র‌্যাব আগের মতো থাকবে না, নামও পরিবর্তন হতে পারে। 

তিনি বলেন, ‘এতদিন পর্যন্ত র‌্যাব পুলিশ ব্যাটালিয়নের একটা অপশনের অধীনে কাজ করছিল। সো, একটা পূর্ণাঙ্গ আইন হচ্ছে। যে আইনের মধ্যে র‌্যাবের সবকিছু অনেক বেশি ওয়েল ডিফাইনড থাকবে। সুতরাং র‌্যাব বিলুপ্তির যে দাবি বিএনপি করেছিল, এক অর্থে, আবারও বলছি, এক অর্থে সেভাবে র‌্যাব থাকছে না এবং নামও সম্ভবত পালটে যাচ্ছে। সম্ভবত বলছি কারণ এই ধরনের অপশন গতকাল মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন এবং উনি সেটাও জানিয়েছেন যে, এ আইনটা করার জন্য তিনি অ্যাক্টিভলি কাজ করছেন।’

উপদেষ্টা বলেন, ‘একটা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার, আবার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হতে চায়, সে একটা বাহিনীকে কোনোভাবে ব্যবহার করবে না। তবে একটা রাষ্ট্রে একটা এলিট ফোর্স থাকা দরকার আছে। কারণ র‌্যাবের সমালোচনা যদি সরিয়ে রাখি, আমরা দেখব র‌্যাব অত্যন্ত ক্যাপাবলভাবে নানা ধরনের সন্ত্রাস তারা মোকাবিলা করতে পেরেছে, অপরাধ মোকাবিলা করতে পেরেছে, যেটা আমাদের কনভেনশনাল পুলিশ বাহিনী পেরে ওঠেনি।’

সম্প্রতি র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জননিরাপত্তা রক্ষায় একটি এলিট ফোর্স লাগবে। এডহক ভিত্তিতে র‌্যাব পরিচালিত হচ্ছে। এটা ঠিক নয়। তাই এখন র‌্যাবের জন্য আইন করা হচ্ছে। আগামী দিনে সম্পূর্ণভাবে মানবাধিকারকে সমুন্নত রেখে একটি নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছি। যে আইনের অধীনে একটি এলিট ফোর্স হিসেবে একটা বাহিনী থাকবে। নতুন প্রত্যাশা অনুযায়ী জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, অথরিটি থাকবে রেসপন্সিবিলিটি থাকবে। সঙ্গে সঙ্গে সেই বাহিনীর ট্রান্সপারেন্সি এবং অ্যাকাউন্টিবিলিটি নিশ্চিত করা হবে, সেই একই আইনে। র‌্যাবের কিছু কর্মকর্তার কারণে প্রতিষ্ঠান হিসেবে র‌্যাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না বিগত পতিত শাসন আমলে যে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সেটা পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠান হিসেবে। 

রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে র‌্যাবকে ব্যবহার করা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মর্নিং সোজ দ্য ডে। তিন মাস হয়েছে। র‌্যাব কি ব্যবহৃত হয়েছে? পুলিশ ব্যবহৃত হয়েছে? অন্য কোনো বাহিনী ব্যবহৃত হয়েছে? পলিটিক্যাল উদ্দেশ্যে হয়েছে? সুতরাং মর্নিং শোজ দ্য ডে।

অতীতে র‌্যাবের কিছু সদস্যের কর্মকাণ্ডের কারণে বাহিনীটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এসব অভিযোগ দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। মানবাধিকার সংগঠন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং কূটনৈতিক প্রতিবেদনে বহু বছর ধরে র‌্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা বা ‘ক্রসফায়ার’, গুম ও নিখোঁজের ঘটনা, হেফাজতে নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও ঘুষ গ্রহণ, জমি দখল এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে।

র‌্যাবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। বিভিন্ন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্যে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনা প্রকৃতপক্ষে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং অধিকার বহু প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছে যে, আটক ব্যক্তিদের আদালতে না নিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ নামে হত্যা করার ঘটনা বছরের পর বছর ধরে ঘটেছে।

র‌্যাবের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগও ব্যাপকভাবে আলোচিত। বিভিন্ন পরিবারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যক্তিকে তুলে নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-এর দশকে গুমের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের অভিযোগের বড় একটি অংশে র‌্যাবের নাম এসেছে।

আটক ব্যক্তিদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও বহুবার উঠেছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, জিজ্ঞাসাবাদের নামে ভয়ভীতি, মারধর এবং স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। 

বিভিন্ন প্রতিবেদনে র‌্যাবের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ঘুষ গ্রহণ এবং প্রভাব খাটিয়ে জমি দখলের অভিযোগ উঠে এসেছে।

বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় র‌্যাবকে বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং গুমের ঘটনায় ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও তখনকার সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের মাধ্যমে র‌্যাব এবং এর কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞার কারণ হিসেবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। এ পদক্ষেপের ফলে র‌্যাবকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও জোরালো হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানানো হলেও বিষয়টি বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

প্রসঙ্গত, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস দমন ও গুরুতর অপরাধ মোকাবিলার উদ্দেশ্যে গঠিত বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট। এটি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে পরিচালিত একটি এলিট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

র‌্যাব ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ গঠিত হয় এবং একই বছরের ১৪ এপ্রিল থেকে তাদের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। দি আর্মড পুলিশ অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯ (২০০৪ সালের সংশোধনী) অনুযায়ী বাংলাদেশ পুলিশের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সদস্যদের সমন্বয়ে র‌্যাব গঠিত হয়। 

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  আমূল পরিবর্তন   র‌্যাব  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close