ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব শিগগিরই দেশে ফেরার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এক সাক্ষাৎকারে তার বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং অন্যান্য রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এই সভানেত্রী।
তিনি স্পষ্ট করেছেন, তার প্রত্যাবর্তন কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা সময়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এখনো টিকে আছে বলে তার দাবি। তিনি দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, কোনো হুমকি বা নিষেধাজ্ঞা আওয়ামী লীগকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। তিনি অবিলম্বে দলের রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিও জানিয়েছেন।
এদিকে বর্তমান সরকারও আওয়ামী লীগের প্রতি কিছুটা নমনীয়। দেশে ফেরা প্রসঙ্গে- শেখ হাসিনার প্রতিও ‘ইনসাফ’ থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও দলটির ফেরার ব্যাপারে জোরালো অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সারা দেশে তাদের বড় আকারে মিছিল-মিটিং হচ্ছে প্রতিদিনই। তাছাড়া বিএনপি ও জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে নিজেদের সংগঠিত করছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ বিভিন্ন কৌশল এবং বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার কিছু রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ নিয়ে মাঠে ফেরার চেষ্টা করছে। একইসঙ্গে অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দলটির নেতাকর্মী-সমর্থকদের ব্যাপক প্রচার-প্রচারণায় দলটির দেশে ফেরার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তবে কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত গণহত্যা ও বিচারের আগে দলটিকে দেশের মানুষ কোনোভাবেই আর রাজনীতিতে মেনে নেবে না।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ রয়েছে। তবে ফাঁসির রায় উপেক্ষা করেই দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন শেখ হাসিনা।
সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ’-এর ফেসবুক পেজে এমনই একটি অডিও-বার্তা পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, ‘জেল রেডি করেন, ফাঁসির মঞ্চ রেডি করেন আমি আসছি, আসব’। ওই অডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমাকে একটার পর একটা মামলা দিয়ে মিথ্যে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। আমি এটা পরোয়া করি না। আমি বলব ঠিক আছে, জেলখানা রেডি করেন, ফাঁসির মঞ্চ রেডি করেন। আমি আসছি, আসব।’
ওই বার্তায় তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখার জন্য এবং যথাসময়ে দেশে ফিরে আসার জন্য তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
‘মাথা উঁচু করে ফিরব’
বাংলাদেশে ফেরার প্রশ্নে সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা দিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের অবস্থান ঘিরে টানাপোড়েনের মধ্যেই তিনি বলেছেন, ‘মাথা উঁচু করে দ্রুত দেশে ফিরব।’ গত মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এ মন্তব্য করেন।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেন, তাকে একাধিকবার হত্যাচেষ্টার মুখে পড়তে হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি। দীর্ঘ নির্বাসনের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৮১ সালে যেমন দেশে ফিরেছিলেন, তেমনি এবারও ফিরবেন। তার ভাষায়, দেশে ‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই ফেরার প্রস্তুতি চলছে।
আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও নেতাকর্মীদের বিদেশে অবস্থান প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, শত শত নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। দেশের বাইরে থাকা নেতাদের বড় অংশ পরিস্থিতির চাপে দেশত্যাগ করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তার দাবি, দলীয় সাংগঠনিক তৎপরতা নীরবে চলমান আছে।
সম্মিলিতভাবে দেশে ফেরার ঘোষণা নেতাকর্মীদের :
যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম সম্প্রতি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পালিয়ে যাননি, বরং আইনি ও রাজনৈতিক মোকাবিলা করে সম্মিলিতভাবেই তারা দেশে ফিরবেন।
শ ম রেজাউল করিম জোর দিয়ে বলেছেন যে, দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও নেতাকর্মীরা একসঙ্গে বা সম্মিলিতভাবেই দেশে ফিরে আসবেন। তিনি দাবি করেন, দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো মোকাবিলা করবেন তারা।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে রিসিভ করতে ঢাকা বিমানবন্দরে ২ কোটি লোক উপস্থিত হবে বলে জানিয়েছেন সিলেটের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। সম্প্রতি লন্ডন থেকে প্রচারিত ‘ভয়েস অব টাওয়ার হেমলেটস’ নামক একটি অনলাইন প্লাটফর্মে তিনি এসব কথা বলেন।
এদিকে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার প্রতি ‘ইনসাফ’ থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে ফেরত আসেন, তাকে কোনো এক্সট্রা জুডিশিয়াল (বিচারবহির্ভূত) কিছু করা হবে না।
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘একটা কথা খেয়াল রাখা দরকার, শেখ হাসিনাকে আমরা ক্ষমতা থেকে হঠাতে চেয়েছি, কারণ তিনি ইনসাফ করেননি।...পরবর্তী যে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে, সেটার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে ইনসাফ...শত্রুর প্রতিও ইনসাফ থাকবে। শেখ হাসিনার প্রতিও আমাদের ইনসাফ থাকবে। শেখ হাসিনা যদি আসেন বাংলাদেশে। তাকে কোনো এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিছু আমরা করব না।’
‘আওয়ামী লীগ ছিল, ‘ব্যাক’ করেছে তাদের দম্ভ’
জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ‘ফেরা’ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ফেসবুক পোস্ট নিয়ে আলোচনার মধ্যে এ নিয়ে কথা বলেছেন আরেক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। গতকাল বুধবার দুপুরে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ নজরুল লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেনি, তারা ছিলই। ব্যাক করেছে তাদের দম্ভ, মিথ্যাচার আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার দুঃসাহস।’
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ফিরে আসা নিয়ে আসিফ নজরুলের এই পোস্টে মাহফুজ আলমের বক্তব্যের ভিন্নতা খুঁজে পাচ্ছেন নেটিজেনরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের তিন মাসের বেশি সময় পর গত মঙ্গলবার মাহফুজ আলম এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো, মাজারে ও হিন্দুদের ওপর হামলা এবং ডানপন্থিদের উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ব্যাক’ করেছে।
আওয়ামী লীগ ফেরা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, ‘আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত গণহত্যা ও বিচারের আগে দলটির রাজনৈতিক পুনর্বাসন কিংবা দেশে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। তাদের ফ্যাসিবাদী আচরণ ও গণহত্যার পর দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে কোনোভাবেই আর রাজনীতিতে মেনে নেবে না।’
কেকে/ এমএস