‘ছেলেটা বলেছিল মালয়েশিয়া গিয়ে টাকা পাঠাবে, ঘর ঠিক করবে। তারপর একদিন ফোন বন্ধ হয়ে গেল। ১৫ বছর ধরে অপেক্ষা করছি, আজও ফিরে আসেনি।’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন বান্দরবানের সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের এক বৃদ্ধা মা।
তার ছেলে মো. দেলোয়ার হোসেন দেড় দশক আগে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়লেও এরপর আর কোনো খোঁজ মেলেনি। শুধু তিনি নন—একই অপেক্ষা, একই দীর্ঘশ্বাস আর একই কান্না এখন পুরো বাইশারীজুড়ে।
স্থানীয় সূত্র, জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বছর শীত মৌসুম এলেই বাইশারী ইউনিয়নে বাড়তে থাকে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রবণতা। সমুদ্র শান্ত থাকায় দালালচক্র এই সময়টাকেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে। গত কয়েক মাসেই ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন যুবক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে কক্সবাজার উপকূলে নিয়ে যায়। পরে গভীর রাতে ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়। মাঝসমুদ্রে পৌঁছানোর পর শুরু হয় ভয়াবহ নির্যাতন। পরিবারগুলোর কাছ থেকে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা আদায়ের জন্য যাত্রীদের জিম্মি করে মারধর ও নির্যাতন করা হয়। টাকা না পেলে অনেককে সাগরে ফেলে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাইশারী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের যৌথ খামার পাড়া, উত্তর বাইশারী, লম্বাবিল তিতারপাড়া, করলিয়ামুরা, হলুদিয়াশিয়া, পূর্ব বাইশারী, নারিচবুনিয়া ও কাগজিখোলা এলাকা থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় গেছেন। অনেকেই আর ফিরে আসেননি।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা যুবকদের বর্ণনা
বছরখানেক আগে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ইন্দোনেশিয়ায় আটক হয়ে দীর্ঘ কারাভোগ শেষে দেশে ফেরা করলিয়ামুরার মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল মালয়েশিয়ায় ভালো চাকরি আছে। কিন্তু মাঝসমুদ্রে নিয়ে গিয়ে দালালরা মোবাইল দিয়ে বাড়িতে ফোন করায়। বলে ৭ লাখ টাকা না দিলে মেরে সাগরে ফেলে দেবে। যারা টাকা দিতে পারেনি, তাদের নির্মমভাবে মারধর করা হয়েছে। আমরা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি।’
আরেক ভুক্তভোগী মো. মুফিজুর রহমান বলেন, ‘ট্রলারে খাবার ছিল খুব কম। অসুস্থ হলেও চিকিৎসা ছিল না। অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিল। পরে ইন্দোনেশিয়ার কোস্টগার্ড আমাদের আটক করে। প্রায় এক বছর জেলে ছিলাম। পরে আন্তর্জাতিক একটি এনজিওর সহায়তায় দেশে ফিরেছি।’
১৫ বছরেও ফেরেনি সন্তানেরা
স্থানীয়দের তথ্যমতে, প্রায় দেড় দশক আগে একইভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া কয়েকজনের এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি। তাদের মধ্যে রয়েছেন নারিচবুনিয়া এলাকার মো. ফজলুল হক, হলুদিয়াশিয়া এলাকার মো. দেলোয়ার হোসেন, পূর্ব বাইশারী এলাকার মো. মনছুর আলম ও কাগজিখোলা এলাকার মো. আব্দুল জলিলসহ আরও অনেকে।
নিখোঁজ মো. ফজলুল হকের বৃদ্ধ মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলে বিদেশে গেলে সংসার ভালো হবে—এই আশায় যেতে দিয়েছিলাম। এখন শুধু অপেক্ষা করি। ১৫ বছর হয়ে গেছে, কোনো খবর নেই। মানুষ বলে আর বেঁচে নেই। কিন্তু মায়ের মন তো মানে না।’
মো. দেলোয়ার হোসেনের বড় ভাই বলেন, ‘অনেক খোঁজ করেছি। কোথাও কোনো সন্ধান পাইনি। পরে পরিবারের সবাই মিলে কুলখানি করেছি। তারপরও মনে হয়—হয়তো একদিন দরজায় এসে দাঁড়াবে।’
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘দালালরা গ্রামের অসহায় মানুষদের টার্গেট করছে। কেউ জমি বিক্রি করছে, কেউ ঋণ নিচ্ছে। পরে সন্তান হারিয়ে পথে বসছে পরিবারগুলো।’
পাশের এলাকাতেও একই চিত্র
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাইক্ষ্যংছড়ির পাশের গর্জনিয়া ইউনিয়ন ও ঈদগড় ইউনিয়ন থেকেও শত শত যুবক ইতোমধ্যে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারের বিভিন্ন উপকূলে আটক হয়েছেন। বহু পরিবার এখনো স্বজনদের ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে।
মো. আলম (কোম্পানি) বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। কিছু দালাল সহজ-সরল মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধ পথে বিদেশে পাঠাচ্ছে। এতে অনেক পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। প্রশাসনের পাশাপাশি সামাজিকভাবেও সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া বন্ধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সচেতন মহলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। না হলে আরও অনেক পরিবার সন্তান হারাবে।’
কেকে/ এমএস