বগুড়ার মহাস্থানগড় হাটে পশুর বিশাল সমাগম হচ্ছে। ওপর থেকে তাকালে মনে হয় যেন মাঠজুড়ে বসেছে পশুর মেলা। তবে, হাজার হাজার গরু-ছাগলে ভরে ওঠলেও কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা না থাকায় বেচাকেনায় দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জেলার খামারিরা সারা বছর ধরে লালন-পালন করা পশু নিয়ে ভিড় করেছেন এই হাটে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। হাটে ভিড় থাকলেও ক্রেতাদের আগ্রহ এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। অনেকেই ঘুরে ঘুরে গরু দেখছেন, দরদাম করছেন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না।
বুধবার (২০ মে) মহাস্থানগড় হাট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
হাটে আসা কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দাম নিয়ে রয়েছে দ্বিধা। শহিদুল ইসলাম নামে ক্রেতা বলেন, “গরু মোটামুটি ভালোই আছে, কিন্তু দাম বেশি চাচ্ছে। আরেকটু কম হলে নেওয়া যেত।”
আরেক ক্রেতা আব্দুল মালেক বলেন, “একটা গরু কিনলাম ৫৫ হাজার টাকায়, কিন্তু হাসিল দিতে হয়েছে ১ হাজার ২০০ টাকা। এতে খরচ অনেক বেড়ে যায়।”
রফিকুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা বলেন, “দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা আছে। শেষ দিকে এলে হয়তো ভালো দামে কেনা যাবে।”
অন্যদিকে বিক্রেতাদের মধ্যে দেখা গেছে হতাশা ও দুশ্চিন্তা। খামারি জহুরুল মিয়া দুইটি উন্নত জাতের গরু নিয়ে হাটে এসেছেন।
তিনি বলেন, “আমরা যে দামে গরু পালন করি, সেই অনুযায়ী দাম পাচ্ছি না। ক্রেতারা অনেক কম বলছে।”
একই আক্ষেপ করেন আরেক বিক্রেতা বিপ্লব কুমার। তিনি বলেন, “১০টা গরু এনেছি, এখন পর্যন্ত একটা বিক্রি হয়েছে। ক্রেতা কম, যারা আসছে তারা ঘুরে চলে যাচ্ছে।”
খামারিরা জানান, গরুর খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বাজারে দাম না পাওয়ায় অনেকেই ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
প্রান্তিক খামারি আবু হানিফ বলেন, “দীর্ঘ সময় ধরে গরু লালন করেছি। খরচ উঠবে কি না তা নিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় আছি।”
তবে, বড় খামারিরা এখনো আশা ছাড়ছেন না। স্থানীয় খামার মালিক মাহবুব রহমান বলেন, ‘আজ ১৫টির মতো গরু এনেছি, কয়েকটি বিক্রি হয়েছে। আশা করছি, শেষ মুহূর্তে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে।”
এদিকে, হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। ক্রেতা ও বিক্রেতারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত হারের বাইরে গিয়ে গরু ও ছাগলের ওপর অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে, যা নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার জিয়াউর রহমান বলেন, ‘‘বুধবার মহাস্থান গরুর হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অভিযোগ পেয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইজারাদারকে সর্তক করা হয়েছে।’’
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্র জানায়, এবার কুরবানির জন্য বগুড়ায় ৫১ হাজার ৭৪৬ জন খামারি গরু প্রস্তুত করেছেন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৫১ হাজার ১৪৬। তবে পশুর মোট সংখ্যা কিছুটা কমেছে। এবার প্রস্তুত করা হয়েছে ৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৩৭টি পশু, যা গত বছরের তুলনায় ৬ হাজার ৩০৫টি কম।
প্রস্তুত পশুর মধ্যে গরুর সংখ্যা ২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৮৪টি। এর মধ্যে ষাঁড় ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯০৪টি, বলদ ৪২ হাজার ৩২৮টি এবং গাভী ৬৩ হাজার ৫৫২টি। এছাড়া রয়েছে ২ হাজার ১৫৫টি মহিষ, ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৫৬৯টি ছাগল ও ৫৪ হাজার ২৯টি ভেড়া।
বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. কাজী আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘‘এ বছর ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি কুরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি। জেলার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চাহিদা ৪ লাখের কিছুটা বেশি। অতিরিক্ত ৩ লাখ পশু দেশের বিভিন্ন হাটে বিক্রি হবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘শেষ মুহুর্তে ভারত ও মিয়ানমার থেকে চোরাপথে গরু না আসলে দাম স্বাভাবিক থাকবে। ফলে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্থ হবেন না।’
কেকে/এমএ