নেত্রকোণায় ৬৩ টন সরকারি চাল উদ্ধারের ঘটনায় কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে দেশের অধিকাংশ চিহ্নিত খাদ্য গুদামকে। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নিজেই খোঁজ নিচ্ছেন সন্দেহজনক গুদামগুলোর। তাকে সহযোগিতা করছেন অধিদপ্তরের চৌকস কয়েক কর্মকর্তা। গুদাম ইনচার্জদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে- অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়ালে কেউ ছাড় পাবেন না। কেউ নয়ছয় করলে তারও মদনের দুর্নীতিবাজদের মতো পরিণতি হবে। মহাপরিচালক এরই মধ্যে ওসিএলএসডি, এসএমও এবং ম্যানেজারদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
দৈনিক খোলা কাগজের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা জানান। মাঠপ্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন নতুন মহাপরিচালক মু. জসীম উদ্দিন খান।
সূত্র জানায়, নেত্রকোণার মদনের ঘটনায় বিধি অনুযায়ী আগাচ্ছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে অভিযুক্ত দুই খাদ্য কর্মকর্তা প্রত্যাহার হয়েছেন। সংযুক্ত করা হয়েছে পটুয়াখালী ও বরগুনার কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। আগামী রোববার তারা সাময়িক বরখাস্ত হবেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। শুরু হবে বিভাগীয় মামলা। তাদের সঙ্গে জড়াবেন ওই গুদামের সহকারী উপ খাদ্য পরিদর্শক ও দুই দারোয়ান। হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও মদনের প্রাক্তন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং ওসিএলএসডি ঘটনা ধামাচাপার প্রাণান্ত চেষ্টা চালান। অন্যদিকে সরকারি চাল উদ্ধারের খবর পেয়েই মহাপরিচালক দ্রুত অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগারে অতিরিক্ত পরিচালককে ঘটনাস্থলে পাঠান।
জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে পাচারের সময় পুলিশ মদন থেকে ২০ টন সরকারি চাল উদ্ধার করে। এ বিষয়ে কড়া নজর দেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মু. জসীম উদ্দিন খান। শনিবার ঘটনাস্থলে পাঠান অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সেলিমুল আজমকে। তিনি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের তিন সদস্যের তদন্ত টিমসহ বিকালে গুদামে যান। সকল কাগজপত্র পরীক্ষা ও চাল পরিমাপ করে দুই নম্বর গুদামের ডেলিভারি পয়েন্টে অবৈধভাবে রাখা ৪৩ টন ৫৬০ কেজি চাল পান। তাৎক্ষণিক মহাপরিচালককে বিষয়টি জানিয়ে তিনি জব্দ তালিকা তৈরি ও গুদাম সিলগালা করেন। রেকর্ড অনুযায়ী ৩০ কেজির ১ হাজার ৪৫২ বস্তায় চালগুলো দুই নম্বর গুদামের ১৯১১৬৫৩৩১ ডেলিভারি খামালে রাখা ছিল।
সূত্র জানায়, মদনের মতো নেত্রকোণার কয়েকটি গুদামের একই অবস্থা। অভিযানের ভয়ে ওইসব গুদামে থাকা অতিরিক্ত চাল এরই মধ্যে ক্রয় দেখিয়ে অ্যাডজাস্ট করা হয়। সংগ্রহের নামে জারিয়া, বারহাট্টা, কলমাকান্দা ও কেন্দুয়া গুদামে ৮০০ টন নিম্নমানের পুরোনো চাল অ্যাডজাস্ট করা হয়েছে। প্রক্রিয়ার সঙ্গে চিহ্নিত এক খাদ্য কর্মকর্তা ও মিল মালিক সিন্ডিকেট জড়িত। সূত্র মতে, ১৭ মে’র ক্রয় তালিকার সঙ্গে আগে ও পরের দুইদিনের অসঙ্গতি রয়েছে। হঠাৎ বেড়েছিল ক্রয়ের পরিমাণ। এদিন জেলায় ১ হাজার ১১৯ টন ৯০ কেজি চাল ক্রয় দেখানো হয়। এর দুইদিন আগে ও পরে ক্রয়ের গড় ফিগার ৬৫০ টন। ১৬ মে মদন গুদাম থেকে ৪৩ টন ৫৬০ কেজি অতিরিক্ত চাল উদ্ধারের পরের দিন জেলার অন্যান্য গুদামে থাকা অতিরিক্ত ও পুরোনো চাল অ্যাডজাস্ট করা হয়। সূত্র মতে, দীর্ঘ দুই যুগ ধরে নেত্রকোণার অধিকাংশ গুদামে এ ঘটনা চলে আসছে। শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে অসাধু কর্মকর্তারা নিজেদের বখরা আদায় করে সব অনিয়ম ও দুর্নীতি জায়েজ করেন।
জানা যায়, মোটা অঙ্ক লেনদেনের কারণে দীর্ঘ দেড়যুগ ধরে খাদ্য অধিদপ্তরে বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট সক্রিয়। অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে যে কোনো গুদামের ওসিএলএসডি, এসএমও এবং ম্যানেজার ধরা পড়লেই চিহ্নিত সিন্ডিকেট তাদের রক্ষায় অধিদপ্তর ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ে হানা দেয়। যে কোনো মূল্যে তারা অবৈধ কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে সক্ষম হয়। কিছুদিনের মধ্যে দুর্নীতিবাজরা অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে পুরোনো কায়দায় ফিরে যায়। খাদ্য অধিদপ্তরে এমন দুটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় রয়েছে। মাঝে-মধ্যেই এরা কোটি টাকা তহবিল গঠন করে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সরিয়ে দিতে কলকাঠি নাড়ে।
সূত্র জানায়, সারা দেশে ক্লিন ইমেজের শত শত উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও খাদ্য পরিদর্শক থাকলেও চাইলেই তারা গুদামের ওসিএলএসডি, এসএমও এবং ম্যানেজার হতে পারেন না। দুর্নীতিবাজরাই মোটা অঙ্কের বিনিময়ে ঘুরে ফিরে গুদামের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। এদের কারণে দেশের বিভিন্ন গুদামে সরকারি চাল চুরি, গায়েব ও পাচারের মতো স্পর্শকাতর ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোণার পরিস্থিতি খুবই নাজুক। সরেজমিন চিহ্নিত গুদামগুলোর খামাল ভেঙে যাচাই-বাছাই করলেই নিম্নমানের ও পুরোনো চাল পাওয়া যাবে। অন্যদিকে কোনো কোনো গুদামের ওসিএলএসডি, এসএমও এবং ম্যানেজারের কারণে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রককে নাকানি-চুবানি খেতে হয়। এমন বহু নজির আছে বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায়।
কেকে/এমএ